চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ২৯ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার সকালে, বেইজিংয়ে মহাগণভবনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। উভয়পক্ষ চীন ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী ও স্থিতিশীল সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।

সি চিন পিং বলেন, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি অস্থির ও জটিল। চীন ও যুক্তরাজ্য জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ও বিশ্বের প্রধান দুটি অর্থনীতি হিসেবে, বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা হোক বা উভয় দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়ন হোক—সব ক্ষেত্রে বেইজিং ও লন্ডনের মধ্যে সংলাপ ও সহযোগিতা জোরদার করা জরুরি। বৃহত্তর ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ ধারণ করে, চীন যুক্তরাজ্যের সাথে মতপার্থক্য অতিক্রম করে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সংলাপ ও যোগাযোগের মাধ্যমে চীন-যুক্তরাজ্য সহযোগিতার বিশাল সম্ভাবনা বাস্তব সাফল্যে রূপান্তর করতে এবং দু’দেশের সম্পর্ক ও সহযোগিতার জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে আগ্রহী, যা শুধু দুই দেশের জনগণের জন্যই কল্যাণকর হবে না, বরং সমগ্র বিশ্বের জন্যও উপকারী হবে।

প্রেসিডেন্ট সি বলেন, পারস্পরিক বিশ্বাস হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক স্থিতিশীলভাবে উন্নয়নের ভিত্তি। চীন সর্বদা শান্তিপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণ করে আসছে, চীন কখনোই কোন যুদ্ধ শুরু করেনি বা অন্য দেশের এক ইঞ্চি জমিও দখল করেনি। চীন যতটাই উন্নত ও শক্তিশালী হবে না কেন, অন্য কোনো দেশের জন্য হুমকি তৈরি করবে না। চীনের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ‘শান্তিকে সবচেয়ে মূল্যবান মনে করা’ এবং ‘সম্প্রীতির মধ্যেও ভিন্নতা থাকতে পারে—এ ধারণা প্রচার করে। চীন-যুক্তরাজ্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতার প্রকৃতি হচ্ছে পারস্পরিক কল্যাণ ও উভয়ের জয়। গত বছর ছিল চীনের ‘চতুর্দশ পাঁচশালা’ পরিকল্পনার শেষ বছর। চলতি বছর চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচশালা’ পরিকল্পনার সূচনাকাল। তাই দুই পক্ষের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অর্থসংস্থান ও সেবা খাতে পারস্পরিক সুবিধাজনক সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জীববিজ্ঞান, নতুন শক্তি ও নিম্ন কার্বন প্রযুক্তির মতো ক্ষেত্রগুলোতে যৌথ গবেষণা ও শিল্প রূপান্তর সম্প্রসারণ করা উচিত, যাতে যৌথ উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন করা যায়। চীন আশা করে, যুক্তরাজ্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ন্যায্য, সুবিচারমূলক ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ গড়ে তুলবে। চীন ও যুক্তরাজ্য উভয়ই সংস্কৃতির মহাশক্তিধর দেশ এবং উভয়ই মানব জাতির উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। তাই উভয় পক্ষকে সাংস্কৃতিক বিনিময় ও জনসংযোগ জোরদার করতে হবে এবং জনগণের মধ্যে চলাচল আরো সুবিধাজনক করতে হবে। চীন, যুক্তরাজ্যের সরকার, সংসদ ও বিভিন্ন স্তরের জনগণকে আরো বেশি করে চীন সফরের আমন্ত্রণ জানায়, যাতে তারা চীন সম্পর্কে একটি পূর্ণ, বস্তুনিষ্ঠ ও সঠিক ধারণা পেতে পারেন। চীন যুক্তরাজ্যের জনগণের জন্য একতরফা ভিসামুক্ত নীতির বিষয়ে ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে ইচ্ছুক।

সি চিন পিং আরও বলেন, কিছু সময় ধরে, একতরফাবাদ, সংরক্ষণবাদ ও শক্তির রাজনীতির ব্যাপক প্রচলন ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন তখনই সত্যিকার অর্থে কার্যকর হয়, যখন সব দেশ তা মেনে চলে। বিশেষ করে মহাশক্তিধর দেশগুলোকে নেতৃত্ব দিতে হবে, নয়তো আবার জঙ্গিবিশ্বে ফিরে যেতে হবে। চীন ও যুক্তরাজ্য উভয়ই বহুপাক্ষিকতা ও মুক্ত-বাণিজ্যের সমর্থক। তাই উভয়পক্ষের সত্যিকারের বহুপাক্ষিকতার পক্ষে সমর্থন দেয়া ও তা বাস্তবায়ন করা এবং আরো ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে একসঙ্গে কাজ করা উচিত। একই সাথে উভয়পক্ষের সমতা-ভিত্তিক ও শৃঙ্খলাপূর্ণ বহুমেরুকরণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বায়ন বাস্তবায়নের জন্য কাজ করা উচিত।


স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্টকে শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, ৮ বছরের মধ্যে চীন সফর করা যুক্তরাজ্যের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি খুবই গর্বিত। এ সফরে তিনি যুক্তরাজ্যের ৬০ জনেরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্য এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রের প্রতিনিধিকে নিয়ে এসেছেন, যা যুক্তরাজ্য-চীন সহযোগিতার ব্যাপ্তি এবং চীনের সঙ্গে সহযোগিতা সম্প্রসারণ ও জোরদারে যুক্তরাজ্যের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে। যুক্তরাজ্য ও চীন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। বর্তমান অস্থির ও ভঙ্গুর আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আস্থার চেতনা ধারণ করে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল সর্বাত্মক কৌশলগত অংশীদারিত্বের সম্পর্ক গড়ে তোলা যুক্তরাজ্যের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 


তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিন ধরে অনুসৃত নীতি পরিবর্তিত হয়নি এবং হবে না। উচ্চ পর্যায়ে যোগাযোগ বজায় রাখা, সংলাপ ও বিনিময় জোরদার করা এবং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অর্থসংস্থান, পরিবেশ সুরক্ষা ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করার মাধ্যমে উভয় দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গতিশীলতা যোগ করতে এবং দু’দেশের জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনতে যুক্তরাজ্য চীনের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী। জনগণের মধ্যে যত বেশি যোগাযোগ হবে, তত বেশি পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়বে। তাই যুক্তরাজ্য চীনের সঙ্গে দুই দেশের আইনসভাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগাযোগ জোরদারে কাজ করতে আগ্রহী। 


হংকংয়ের সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা দুই দেশের সাধারণ স্বার্থের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যুক্তরাজ্য হংকংকে যুক্তরাজ্য ও চীনের মধ্যে একটি অনন্য গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে দেখতে পেরে আনন্দিত। চীন আন্তর্জাতিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তাই জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যুক্তরাজ্য চীনের সঙ্গে সহযোগিতা জোরদার করতে এবং বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় একসঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী বলেও জানান স্টারমার।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়া ই দু’নেতার সাক্ষাতের সময় উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র:স্বর্ণা-হাশিম-লিলি,চায়না মিডিয়া গ্রুপ।