আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

বিমান যখন ভেঙে পড়ে, সেটি কেবল ইস্পাত আর ইঞ্জিনের পতন নয়। সেটি একেকটি মানুষের স্বপ্নের মৃত্যু, পরিবারের কান্না, রাষ্ট্রের ব্যর্থতার এক মূর্ত প্রতীক। মাইলস্টোনে যে বিমানটি বিধ্বস্ত হলো—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই মৃত্যু কাদের গাফিলতিতে? আরও গভীর প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই ট্র্যাজেডিকে আরেকটি খবরের কাগজের চিহ্নে পরিণত করে ভুলে যাব? নাকি এই ঘটনার ভেতরে আত্মসমালোচনার সুযোগ খুঁজে নেব? এত প্রশ্ন জিজ্ঞাসা কোনো ‘স্মরণসভা’র আবেগ ছড়ানো নয়। বরং চেতনায় ঘা দেওয়া। কারণ আমরা যদি বারবার ভুলে যাই, তবে আমরা বারবার মরব—শুধু ভিন্ন বিমানে, ভিন্ন রুটে, কিন্তু একই রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় বারবার পত্রিকার শিরোনাম হবো। সারা পৃথিবী দেখবে বাংলাদেশ নামের একটি দেশ বারবার অচেতন হয়ে ঘুমায়।
যেকোনো যান দুর্ঘটনায় যাত্রীরা কেউ সন্তানের কাছে ছুটে যাওয়া মা, কেউ চাকরির ইন্টারভিউ দিতে যাওয়া তরুণ, কেউবা হানিমুনে যাওয়া নবদম্পতি। কারো জীবনের শেষ এসএমএস ছিল—“অপেক্ষায় থাকো”। সেই অপেক্ষা আজো শেষ হয়নি, হয় না। আর কত খান্ডব দাহণ দেখবো। আমরা ভুলে যাই, বিমান দুর্ঘটনা কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় নয়। এটি রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে নিরাপত্তা সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। বিমানটি উড়তে গিয়েছিল—কিন্তু যারা নিয়ন্ত্রণ করছিল, তারা কি প্রস্তুত ছিল? যান্ত্রিক ত্রুটি, ত্রুটিপূর্ণ মেরামত, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, ভুল সিদ্ধান্ত—এসব কেবল দুঃখজনক নয়, অপরাধ। এই অপরাধ এবং অবহেলা মেনে নেওয়া দায়।
বিমান চালু করার আগে একাধিক চেক-লিস্ট থাকে—ফ্লাইট রেডিনেস, আবহাওয়া সতর্কতা, কমিউনিকেশন সিস্টেম। এসব দায়িত্ব থাকে সিভিল অ্যাভিয়েশন অথরিটি, বিমান সংস্থা, পাইলট, টেকনিশিয়ানদের হাতে। কোনো একটি স্তরে অবহেলা মানেই একটি ‘ঘাতক সিদ্ধান্ত’। এতগুলো স্তরে যদি প্রতিদিন নিয়মিত অনিয়ম হয়, তাহলে রাষ্ট্র কি তা জানে না? যদি জানেও, তবে থামায় না কেন? ঘটনা ঘটার পর প্রেস ও প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে। জানি না এর ফলাফল কি? তবে আমি একজন সাধারণ সচেতন নাগরিক আমার আছে মত প্রকাশের অধিকার তাই কলম ধরাএতগুলো স্তরে যদি প্রতিদিন নিয়মিত অনিয়ম হয়, তাহলে রাষ্ট্র কি তা জানে না? যদি জানেও, তবে থামায় না কেন? আমরা দেখতে পাই, তদন্ত কমিটি গঠনের নামে গা বাঁচানো প্রক্রিয়া চলে। তদন্ত হয়, রিপোর্ট গায়েব হয়। দুর্ঘটনার আসল কারণ চাপা পড়ে ‘অভ্যন্তরীণ সূত্রের অভ্যন্তরে’। এই অব্যবস্থাপনার কারণেই জনগণের আস্থা ধ্বংস হচ্ছে।
একটি জাতি কিভাবে জানে তারা নিরাপদ? — যখন দুর্যোগের পর কেউ এগিয়ে এসে বলে: “আমরা দুঃখিত, এই ব্যর্থতার দায় আমাদের।” আমাদের দেশে এই বাক্যটি এখনও উচ্চারিত হয়নি। প্রত্যেকটি দুর্ঘটনার পর যে ‘তদন্ত কমিটি’ হয়, তাদের রিপোর্ট কবে শেষ হয়, কোথায় জমা পড়ে, কী শাস্তি হয়—জনগণ কিছুই জানে না। এই অস্বচ্ছতা আমাদের প্রমাণ করে দেয়, আমাদের রাষ্ট্র এখনো নাগরিকদের প্রতি সত্যিকার অর্থে দায়বদ্ধ নয়। একজন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছে বেশি কিছু চায় না—সে শুধু চায় নিরাপত্তা, সম্মান ও স্বচ্ছতা। সে চায়, দেশে যেকোনো প্রাকৃতিক এবং যান্ত্রিকভাবে যে কোনো দুর্ঘটনায় যেন সরকার তড়িৎ তদন্ত করে, দায়ীদের বিচার করে, নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো—সংবাদমাধ্যম একদিন চিৎকার করে, দ্বিতীয় দিন চুপ হয়ে যায়। ফেসবুক-টুইটারে কিছু ‘রেস্ট ইন পিস’, তারপর নিস্তব্ধতা।
আমরা জনগণও কম দায়ী নই। আমরা জেনে শুনে অনিরাপদ পরিবেশে যাতায়াত করি, গাফিলতি মেনে নেই, অথচ প্রতিবাদ করি না। এই নিষ্ক্রিয়তা ভবিষ্যতের দুর্ঘটনায় আমাদেরও টেনে নিতে পারে। নিজেকে এবং দেশকে ভালোবাসার আমাদের করণীয়- নিরাপত্তা সংস্কৃতির পুনর্গঠন:-বিমান সংস্থাগুলোতে আন্তর্জাতিক মানে নিরাপত্তা নীতিমালা, ট্রেনিং ও নিয়মিত নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। স্বাধীন তদন্ত কমিটি:-সরকার-নিযুক্ত নয়, বরং বেসামরিক ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের নিয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করা দরকার, যার ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন সংবাদমাধ্যম:-মিডিয়াকে ঘটনা কভার করে ভুলে না গিয়ে ফলো-আপ রিপোর্ট করা শিখতে হবে, যেন ঘটনা চাপা পড়ে না যায়। জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ:- নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষিত তরুণরা যেন এই বিষয়ে সোচ্চার হন। গণস্বাক্ষর, প্রতিবাদ, আলোচনা—সবকিছু জরুরি। আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন:- অবহেলা বা গাফিলতিজনিত মৃত্যুকে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে কঠোর শাস্তির বিধান করতে হবে।
রাষ্ট্র যদি এতগুলো মৃত্যু ঠেকাতে না পারে, তাহলে এই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা কোথায়? তদন্ত রিপোর্ট যদি প্রকাশ না হয়, আমরা কি মানি যে সরকার সত্য বলছে? নিহতদের পরিবার যদি ক্ষতিপূরণ না পায়, তবে আমরা কিসের রাষ্ট্র গড়েছি? একজন নাগরিক হিসেবে আপনি কি প্রতিবাদ করেছেন, নাকি চুপ করে মেনে নিয়েছেন?প্রত্যেক ট্র্যাজেডি একটি আহ্বান। আমরা চাই না, আগামী বছর আবার একটি নতুন ফ্লাইটের নাম নিয়ে একই কলাম লিখতে হোক। আমরা চাই, মাইলস্টোনের ট্র্যাজেডি হোক শেষ হুশিয়ারি। একটি দেশ কত বড় তা বোঝা যায় সে কীভাবে তার নাগরিকদের জীবন রক্ষা করে। আর একটি জাতি কত সচেতন তা বোঝা যায়, তারা কীভাবে অন্যের মৃত্যু থেকে শিক্ষা নেয়। এই মৃত্যুগুলো যেন আর নিঃশব্দ না থাকে। যেন রাষ্ট্র কাঁদে, লজ্জিত হয়, এবং বদলায়।