আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪২ পিএম

নন্দিনী লুইজা
"পৃথিবীতে যা কিছু সৃষ্টি ,কল্যাণ কর অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর" এই পৃথিবীতে নারী এবং পুরুষ এই দুটো মানব সন্তান বাস করছে। আর এই দুটোর সমন্বয়ে পৃথিবী এগিয়ে চলছে সামনের দিকে। নারী ও পুরুষের যদি সমন্বয় না ঘটে তাহলে কিন্তু অনেক বিপর্যয় ঘটে। যদি আমাদের দেশ বাংলাদেশের কথা বলি সেখানেও রয়েছে চরম নারী বৈষম্য। অথচ কবি নজরুল কবিতায় বলেছেন নারী এবং পুরুষের সমন্বয় হওয়াদরকার। এখানে যদি বৈষম্য থেকে থাকে তাহলে উন্নয়ন যেভাবে সম্ভব নয়। পরিবার, সমাজ, দেশ গঠনের ক্ষেত্রেও একটা ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কেননা নারীরা মানুষ তাদের বিদ্যাবুদ্ধির কোনটাই কিন্তু কম নেই। শুধু প্রয়োজন সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা।
আমরা যদি নারীকে সঠিকভাবে তার কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিবেশ তৈরি করে দেই তাহলে দেখব সে অনেক দক্ষতা দিয়ে সমাধান করছে। আমাদের সমাজে এখনো নারীকে বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে, পড়াশোনার ক্ষেত্রে, চাকরি ক্ষেত্রে, শ্রম বাজারের ক্ষেত্রে, পরিবারের ক্ষেত্রে সব জায়গাতেই নারীকে বৈষম্য শিকার হতে হচ্ছে। নজরুল কিন্তু তার কবিতাতে বলেছে পৃথিবীর যা কিছুই কল্যাণ হোক না কেন নারী এবং পুরুষের সমান সমান অধিকার। এই কবিতার লাইনের অর্থ এখনও বুঝি না, আমরা বুঝে উঠতে পারিনি। নেপোলিয়ন কত শত বছর আগে বলেছেন-" আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি একটি জাতি উপহার দেব" তাহলে এই বাক্যের অর্থের মধ্যেও বোঝা যায় নারী সব সময় বৈষম্যের শিকার কেন হবে। যদি নারীকে তার প্রাপ্যটা বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সে নিজেও সম্মানিত হয়, পরিবার সম্মানিত হয়, সমাজ এবং রাষ্ট্র এগিয়ে যায়। এই বিষয়টা কেন আমরা মেনে নিচ্ছি না।
কথায় আছে "ভালোবাসায় বিশ্ব জয় "যা কিছুই আমরা কল্যাণকর করতে চাই না কেন আমরা নারীকে বাদ দিয়ে করতে পারবো না। নজরুল বারবার সাম্যের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন সাম্যের মাধ্যমে যে কোন সমস্যার সমাধান সম্ভব। তাই আমাদের উচিত নারীর অধিকার কে হরণ না করে তার প্রাপ্য সম্মানটা দেওয়া। ব্যবসার ক্ষেত্রেও দেখা যায় সেখানে নারী উদ্যোক্তাদের তার প্রাপ্য প্রাপ্তি যা পাওয়ার কথা সেখানে বলা হয় আপনি নারী এ কাজটা আপনি পারবেন না। শুরুতেই নেতিবাচক কথা বললে যে প্রভাবটা পড়ে তা কিন্তু সমাজকে অনেক দূর পিছিয়ে দেয়। তাই আমাদের নজরুলের যে ভবিষ্যৎবাণী দেশের জন্য, মানবের জন্য তা যদি আমরা একটুখানি চিন্তা করে, বিশ্লেষণ করে জীবন পথ চলি তাহলে আমরা প্রত্যেকেই প্রত্যেকের জায়গা থেকে, সংস্কার করে, সমাজের পরিবর্তন করে রাষ্ট্রের উন্নয়ন করতে পারি। "থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে" যে মানুষটি এই কথাগুলো লিখতে পারে তার চিন্তা চেতনায় মনণশীলতা, দর্শনে শত শত বছর এগিয়ে আছে। আজকে আমরা যারা প্রযুক্তিতে বাস করছি ঠিক তারই কথাগুলোই প্রতিফলিত হচ্ছে।
এ ধরনের ক্ষণজন্মা মানুষগুলো পৃথিবীতে মাঝে মাঝে আবির্ভূত হয় তাঁরা পৃথিবীর পরিক্রমায় কি ঘটনা ঘটবে, ঘটতে যাচ্ছে তাদের লেখনীতে এমন কথা উঠে আসে। তাঁরা ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে অবলীলায় তাদেরই একজন- তারি নাম নজরুল তাতে কোন নেই ভুল। নজরুল মানুষের আপাদমস্ত বিচার বিশ্লেষণ করে তার মূল্যবোধ কি হতে পারে সবকিছুই লিখে গেছেন। তিনি প্রচণ্ড রকমের ভাববাদী বলেই সব ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস। তিনি গোড়ামী ছিলেন না। তিনি সব ধর্মকেই শ্রদ্ধা করে প্রত্যেকটা ধর্মের যে কুসংস্কার গুলো আছে সেগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন আবার তোরা মানুষ হ। "আমি হব সকাল বেলার পাখি"- যদি এই কবিতাটি বিশ্লেষণ করতে চাই সেখানে মানুষের সন্তানেরা কিভাবে তাদের জীবন বোধ তৈরি করবে, তার সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কিভাবে চলানো উচিত তাই কবিতার মধ্যে সে অকপটে বলে গেছেন। আমরা কবিতা পড়ার জন্য পড়ি কিন্তু তার গভীরে ঢুকি না এটা আমাদের বড় একটা দুর্ভাগ্য। কবিতা পড়ে ভালো লাগে, শুনতে ভালো লাগে আমরা অনেক কিছুই বোঝার ক্ষেত্রে নিজেকে শাণিত করি না।
কবিতার ভাষা বুঝিনা। তাহলে কিভাবে আমরা আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ জাগ্রত করব। কবি সাহিত্যিকরা শুধু উপলব্ধি করে লেখেননি, অনুভব করেই লেখেননি তাঁরা বাস্তব দেখে বাস্তবতা নিরিখে লেখার চেষ্টা করেন বা করেছেন। যা যুগে যুগে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। "বিদ্রোহী" কবিতা আজ বুঝি কোন কবি লিখতে পেরেছেন কিনা জানা নেই। বিদ্রোহী কবিতা পড়লে আজও পর্যন্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করে। শত শত বছর বেঁচে থাকবে যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে আর মানুষের মনেকে উজ্জীবিত করার জন্য এমন ধরনের কবিতা জীবনে বড়ই প্রয়োজন বড়ই প্রয়োজন। নজরুল অনেক আগেই বুঝি বাংলার ঐতিহ্য কি, তার প্রতিফলিত কীভাবে ঘটবে তা বুঝতে পেরেছিলেন। আমরা যদি নজরুলকে সঠিকভাবে চিনতে পারতাম তাহলে হয়তো এমন অরাজকতার মধ্যে আমাদের পড়তে হতো না।
তার সাহিত্যচর্চা, গান, কবিতা, গজল যাই বলি না কেন একটা দেশ, জাতি কিভাবে সম্মুখে আগাবে তার নির্দেশনা নজরুল অনেক ভাবেই দিয়েছেন। হয়তো আমরা সাধারণ মানুষ তার মত অত অসাধারণ চিন্তা করতে পারেনি, বিধায় আমরা ব্যক্তি স্বার্থের ক্ষেত্রে সামষ্টিক স্বার্থ ভুলে গিয়ে নজরুলের বলে যাওয়া বাণীকে মূল্যায়ন না করে যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি তা পদে পদে বুঝতে পারছি। কারণ এই ধরনের ক্ষণজন্মারা বারে বারে পৃথিবীতে আবর্তিত হয় না। নজরুলের যদি কবিতা নিয়ে আমরা বিশ্লেষণ করতাম তিনি মানুষ,অর্ধাঙ্গিনী, সংকল্প ইত্যাদি বিভিন্ন লেখা,কবিতায়, সব কিছু ভুলে গেছেন যে একটি পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে গেলে কি কি ওষুধের প্রয়োজন তা তিনি বলেছেন হয়তো আমরা যদি তার এই রেখে যাওয়া কর্মকে অনুসরণ করতাম তাহলে আমাদের জীবনযাত্রা অনেকটাই এগিয়ে যেত এবং প্রযুক্তির সঙ্গে আমরাও তাল দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতাম নজরুল আমাদেরকে সেই নির্দেশনা দিয়েছিলেন।