আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪১ পিএম
.jpg)
কিরণকে আমি যেমনভাবে দেখেছি, সে একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক — সাংবাদিকতার জগতে এক অজানা উপন্যাসের চরিত্রের মতোই এক ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাহী ও আকর্ষণীয় উপস্থিতি। তাঁর কণ্ঠে রয়েছে মিষ্টি ও মধুর সুর, চেহারায় এক রকমের মোহনীয়তা। আচরণে কিরণ অসাধারণভাবে সহজ-সরল ও আন্তরিক। কিরণের সাংবাদিকতা শুরু বাংলাদেশে, ভ্রমণলিপ্সা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আগমন, তারপর ভাগ্যে লেখা ছিল, তাই যুক্তরাষ্ট্রকেই বেছে নিয়েছে স্থায়ী বসবাসের জন্য, কারণ একটাই—কিরণের চাওয়া নির্বিবাদী জীবনযাপন। আমার জীবনে যাদের সাথে পরিচয় হয়েছে, কিরণ তাদের মধ্যে অনন্য। পোশাকে–আশাকে পরিচ্ছন্নতায় কিরণ সদা ফিটফাট, চেহারায় সংক্রামক ধরণের মনোমুগ্ধকর আবেদন—যাকে বলা যায় পার্সোনাল মাগনেটিজম। পোশাকে নীল রঙের প্রাধান্য লক্ষণীয়। বিশাল সমুদ্রের বুকে নীল জলোচ্ছ্বাসের মতোই কিরণ উদার ও বিশাল।
কিরণের জন্ম ৫ই জুলাই—অর্থাৎ কর্কট রাশির পুরুষ। আর কর্কট রাশির পুরুষ মানেই এক ধরনের নীরব গভীরতা, এক অন্তর্মুখী আবেগের বিস্তার। কিরণকে দেখলে প্রথমে যেটা বোঝা যায় না, সেটা হলো—তিনি কতটা সংবেদনশীল। বাইরে থেকে তিনি যতটা শান্ত, ভেতরে তাঁর অনুভূতির জলধারা ঠিক ততটাই প্রবল। সম্পর্কের ক্ষেত্রে তিনি অতিমাত্রায় বিশ্বস্ত; কারও প্রতি একবার আস্থা জন্মালে সেটা সহজে টলে না। তিনি হুট করে কারও ঘনিষ্ঠ হন না, কিন্তু যাঁর সঙ্গে বন্ধন তৈরি হয়, তাঁকে প্রাণ দিয়ে আগলে রাখেন। কিরণ স্মৃতিময়তায় বিশ্বাসী। তিনি অতীতকে ফেলে আসা বলে মনে করেন না, বরং সেটাকে বহন করেন অন্তরে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর। তাঁর চোখে পুরনো দিনেরা আজও স্পষ্ট; মানুষের মুখ, কণ্ঠস্বর, একেকটা গন্ধ, একেকটা বিকেল—সব কিছু তাঁর মনে জীবন্ত। এই অতীতমুখীতা তাঁর সৃজনশীলতাকে সমৃদ্ধ করে; কারণ তিনি লিখতে ভালোবাসেন, অথবা চুপচাপ শুনে নিতে পারেন একটা দীর্ঘ মনখারাপের গল্প—মাঝেমধ্যে যেন নিজেরই বলে মনে হয় সেই গল্পটা।
কিরণ আবেগপ্রবণ হলেও আবেগে গা ভাসান না। বরং আবেগকে নিজের মতো করে গুছিয়ে রাখেন—কখনো একটা চিঠিতে, কখনো কারও পাশে চুপ করে বসে থেকে, কখনো ভেতরের আর্তিটুকু এক নিঃশব্দ দৃষ্টিতে জানিয়ে দেন। নিরাপত্তা তাঁর কাছে বড় ব্যাপার—নিজের জন্য নয়, যাঁদের তিনি ভালোবাসেন তাঁদের জন্য। তিনি চান সবাই ভালো থাকুক, আশ্রয় পাক, স্থিতি খুঁজে পাক জীবনে। কর্কট রাশির পুরুষেরা যেমন শিল্পমনা, তেমনি গহিন। কিরণও তার ব্যতিক্রম নন। তাঁর ভেতরে এক ধরনের জ্যোৎস্নামাখা নিঃসঙ্গতা আছে, যা তাঁকে করুণ নয়, বরং আকর্ষণীয় করে তোলে। তাঁর সঙ্গে বেশি কথা বললে বোঝা যায়, তিনি খুব কম বলেন—কিন্তু যা বলেন তার প্রতিটা শব্দ চিন্তিত, ভারী এবং দরদভরা। সেইজন্যই হয়তো, কিরণ কর্কট রাশির এক নিখাদ প্রতিচ্ছবি—নরম অথচ দৃঢ়, নীরব অথচ তীব্র, একা অথচ গভীরভাবে সম্পর্কনির্ভর।
আমার প্রতিক্রিয়া—আকবর হায়দার কিরন কাজী মন্টু ভাইজানের এই লেখাটি আমার জীবনের সবচেয়ে অমূল্য, সবচেয়ে আবেগময় উপহারগুলোর একটি। নিউ ইয়র্কের সেই হিমশীতল দিনেও তাঁর চেম্বারের ভেতর যে উষ্ণতা, স্মৃতির স্রোত, আর সাংবাদিকতার পুরনো দিনের গল্পে আমরা হারিয়ে গেছিলাম—এটা আমার কাছে অনন্য আশীর্বাদ। যে মানুষ সারাজীবন ইংরেজি সাংবাদিকতা করেছেন, তিনি আমার মতো একজন ছোট মানুষকে নিয়ে এতো প্রাঞ্জল, এতো হৃদয়স্পর্শী বাংলা লিখলেন—এটা ভাবতেই কাঁপছিলাম ভেতরটা। তিনি যখন তাঁর কম্পিউটারের পর্দায় লেখাটি দেখিয়ে পড়লেন, অফিসে তখন শুধু আমরা দুজন। আমার চোখ ভিজে গেল, গলা শুকিয়ে এলো। কতটা ভালোবাসা হলে একজন মানুষ এমন ভাষা দিয়ে আরেকজনকে তুলে ধরতে পারেন? আমি আজও বিশ্বাস করতে পারি না— আমার মতো অসম্পূর্ণ, বারবার ব্যর্থ হওয়া একজন মানুষকে নিয়ে একজন কাজী মন্টু ভাইজান এমন লিখে রাখতে পারেন! তাঁর প্রতি আমার গভীর কৃতজ্ঞতা, শ্রদ্ধা, এবং হৃদয়ের নিঃশব্দ অশ্রুসিক্ত ভালোবাসা। জয়তু কাজী মন্টু ভাইজান।