আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:৪৩ পিএম
.jpeg)
আকবর হায়দার কিরন
বাংলাদেশের সংবাদচিত্র, রাজনৈতিক ইতিহাস ও দৃশ্যমান নথিপত্রের যে ধারাটি আমরা আজ দেখি—তার সবচেয়ে উজ্জ্বল, গুরুত্বপূর্ণ এবং অনিবার্য নামগুলোর একটি হলো লুৎফর রহমান বীনু। জন্ম ঢাকায়, ১৯৫৫ সালে। কিন্তু জন্ম কখন, কোথায়—তা নয়, তাঁর পরিচয়ের মূল চাবিকাঠি হলো কীভাবে তিনি সময়কে ধরে রেখেছেন। ১৯৬৯ সালে কিশোর বয়সে ফটোগ্রাফি হাতে নেয়া বীনু পরিণত হন এক অসাধারণ ফটোসাংবাদিকে। ১৯৭৬ সালে পেশাগত জীবনের সূচনা ‘কিষাণ’ পত্রিকায়, যার পর তাঁর যাত্রা যেন একটানা আলো ও ছায়ার গল্প—জাতির ইতিহাসকে ধারণ করে রাখা এক নিরব অভিযাত্রা। সাপ্তাহিক ‘সন্দেশ’-এ দীর্ঘ ১০ বছরের অভিজ্ঞতা তাঁকে করে তোলে দৃঢ়, সংবেদনশীল এবং শৈল্পিক একজন ফটোজার্নালিস্ট। পরে তিনি কাজ করেন ‘সংগ্রাম’, ‘মর্নিং পোস্ট’, ‘ডেইলি দেশ’, ‘মর্নিং সান’সহ আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকায়।
এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ফটোগ্রাফার—যা তাঁর প্রতিভা ও দক্ষতার এক অসামান্য স্বীকৃতি। দেশ–বিদেশে বীনুর ক্যামেরার শক্তি লুৎফর রহমান বীনুর কাজ সীমাবদ্ধ ছিল না শুধু সংবাদপত্রের পাতায়। তিনি লিখেছেন ও ছবি দিয়েছেন বিশ্বের নামকরা পত্রিকা ও ম্যাগাজিনে— Far Eastern Economic Review, The Telegraph (India), Frontline (India), Hindustan Times, India Today, The Statesman— যেখানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিত্র, সামাজিক স্পন্দন ও নেতৃত্বের প্রতিটি পরিবর্তন তাঁর ছবির চোখে ধরা পড়েছে।
১৯৮৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় প্রেস ইনস্টিটিউটে আয়োজিত ফটোজার্নালিজম প্রতিযোগিতায় তিনি বিশেষ পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৮৮ সালে স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে FEJB/ESCAP পুরস্কার লাভ করেন পরিবেশ বিষয়ক প্রতিবেদনের জন্য। একই বছরে অর্জন করেন AMIC স্কলারশিপ, সিঙ্গাপুরে প্রশিক্ষণের জন্য। দেশে ও বিদেশে বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী তাঁর কাজকে করে তুলেছে আরও শক্তিশালী ও ঐতিহাসিক— – ১৯৮৮ সালে ঢাকায় জিয়াউর রহমানের জীবনের ওপর একক প্রদর্শনী, – ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রামে ব্যক্তিগত প্রদর্শনী, – ESCAP প্রদর্শনীতে থাইল্যান্ডের ব্যাংককে তাঁর নির্বাচিত কর্ম প্রদর্শন।
ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এক নীরব যোদ্ধা বীনুর ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো হলো— তিনি ছিলেন ‘মুহূর্ত বুঝে নেওয়ার মানুষ’। তাঁর ক্যামেরা ধরা দিয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ মুখগুলো— – রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, – মহান নেতা মওলানা ভাসানী, – প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, – বেগম খালেদা জিয়া, – মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ, – প্যালেস্টাইনের ইয়াসির আরাফাত, – ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁ, – ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট সুচার্তো, – রাজীব গান্ধী, চন্দ্রশেখর, পি.ভি. নরসিংহ রাও, – নওয়াজ শরিফ, রণসিংহে প্রেমাদাসা, – মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট গায়ূম, – এমনকি পোপ জন পল থেকে শুরু করে মাদার তেরেসা পর্যন্ত।
তিনি শুধু ছবি তোলেননি— তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের এবং দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসের নিভৃত দর্শক, এক অনন্য সাক্ষী। বীনুর বড় আকারের বই—এক চলমান ভিজ্যুয়াল আর্কাইভ তিনি ফটোগ্রাফি নিয়ে একাধিক ডাউস সাইজের বই প্রকাশ করেছেন—বড় আকারের এই বইগুলো আজ গবেষক, সাংবাদিক, ফটোশিল্পী—সবার জন্য এক অমূল্য দলিল। এগুলো কেবল বই নয়; এগুলো বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্মৃতি, নথি, দলিল—সময়ের চোখে দেখা বাংলাদেশের ইতিহাস। শেষকথা লুৎফর রহমান বীনু ছিলেন এক বিরল প্রতিভা। একজন মানুষ—যার হাতের ক্যামেরা বদলে দিতে পারে ইতিহাসের ধরণ, স্মৃতির আকার, এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শেখা। তিনি ছিলেন নীরব, বিনয়ী, কিন্তু দৃঢ়চেতা। একজন শিল্পী, যার কাজ সময়ের চেয়ে বড়। একজন ইতিহাসরক্ষক, যার ক্যামেরা আমাদের জাতীয় স্মৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশ তাঁকে মনে রাখবে— ফ্রেমের ভেতর, আলোর রেখায়, প্রতিটি ছবির গভীরে।