NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬ | ১০ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
নিউ ইয়র্কে ১৪ এপ্রিল ‘বাংলা নববর্ষ’ ঘোষণার ঐতিহাসিক রেজুলেশন প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন কানাডার রাজনীতিতে ডলি বেগমের চমক 'মারকুইস হু’স হু' ফাইন্যান্স খাতে দক্ষতার জন্য বাংলাদেশী আমেরিকান মলি রহমানকে সম্মানিত করেছে সিএনএনের প্রতিবেদন ‘গেম অব চিকেন’: সংঘাতের বিপজ্জনক মোড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, অস্থির বিশ্ব অর্থনীতি শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা -  ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ
Logo
logo

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: স্মরণ, বিচার ও আত্মত্যাগের প্রাসঙ্গিকতা   -   নন্দিনী লুইজা


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২৯ পিএম

শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস: স্মরণ, বিচার ও আত্মত্যাগের প্রাসঙ্গিকতা   -   নন্দিনী লুইজা

 ডিসেম্বর এলেই বাংলাদেশের আকাশ ভারী হয়ে আসে। শীতের হালকা কুয়াশার ভেতর লুকিয়ে থাকে রক্তের গন্ধ, চাপা দীর্ঘশ্বাস, আর একটি প্রশ্ন—আমরা কি সত্যিই স্মরণ করতে শিখেছি? ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। এটি কেবল শোক পালনের দিন নয়, এটি জাতির বিবেকের সামনে দাঁড়িয়ে নীরব জবাবদিহির দিন।ছিলেন   বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়-সেগুলো জাতির বিবেক। ১৪ ডিসেম্বর তেমনই একটি দিন। শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় এক নির্মম, পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রবিরোধী হত্যাযজ্ঞের কথা, যা সংঘটিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ প্রান্তে, বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে। এই দিনটি কেবল শোকের নয়; এটি প্রশ্নের, আত্মসমালোচনার এবং দায়বদ্ধতার দিন।   বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৪ ডিসেম্বর একটি গভীর শোক ও আত্মসমালোচনার দিন—শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। ১৯৭১ সালের এই দিনে, স্বাধীনতার চূড়ান্ত বিজয়ের মাত্র দুই দিন আগে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দেশীয় দোসর আল-বদর ও আল-শামস পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের—শিক্ষক, লেখক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী ও চিন্তাবিদদের। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: সদ্য জন্ম নিতে যাওয়া রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব শূন্য মেধা শূণ্য করে দেওয়া।    ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের গণহত্যার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি সুপরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক নিধন। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে আল-বদর ও আল-শামস নামক দেশীয় ঘাতক বাহিনী। ১৯৭১ সালের ১০ থেকে ১৪ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকা—ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, পুরান ঢাকা, রমনা থেকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় শিক্ষক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ দেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবীদের। তাঁরা ছিলেন সমাজের বিবেক, যাঁদের কলম, চিন্তা ও মানবিক স্বাধীনতানেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখতেন—এ কারণেই তাঁদের টার্গেট করা হয়।

একটি জাতিকে দমিয়ে রাখতে হলে শুধু অস্ত্র নয়, চিন্তার উৎস ধ্বংস করতে হয়—এ সত্যটি পাকিস্তানি সামরিক শাসকরা ভালোভাবেই জানত। তাই ১৪ ডিসেম্বর রাতে রায়েরবাজার ও মিরপুর বধ্যভূমিতে তাঁদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়।এই হত্যাকাণ্ড কোনো হঠাৎ প্রতিশোধ নয়; এটি ছিল সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রধ্বংসের অংশ।   বিচার হয়েছে কি: - স্বাধীনতার পরপরই শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচার হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, সামরিক শাসন এবং স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির পুনর্বাসনের ফলে বিচার প্রক্রিয়া কার্যত থমকে যায়। বরং অনেক যুদ্ধাপরাধী ও সহযোগী রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশের সুযোগ পায়। এই সব কিছু নিয়ে আজও আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক শাসন ও বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যকরভাবে এগোয়নি।

তবে একবিংশ শতাব্দীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে কিছু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার হয়েছে-যেখানে আল-বদর সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের দণ্ড কার্যকর হয়েছে। তবুও সত্য বলতে হবে, এ বিচার পূর্ণতা পায়নি। বহু অপরাধী বিচারের বাইরে রয়ে গেছে, কেউ কেউ স্বাভাবিক মৃত্যুও বরণ করেছে।ফলে ন্যায়বিচারের যে নৈতিক তৃপ্তি জাতির পাওয়ার কথা ছিল, তা আজও অসম্পূর্ণ।   তাদের আত্মত্যাগ কি দেশকে সুস্থ করেছে না না না- শহীদ বুদ্ধিজীবীদের আত্মত্যাগ আমাদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে, কিন্তু রাষ্ট্র ও সমাজকে পুরোপুরি “সুস্থ” করে তুলেছে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় না। বিচারহীনতা কেবল অতীতের অন্যায়কে বাঁচিয়ে রাখে না, ভবিষ্যতের অপরাধকেও উৎসাহিত করে। শহীদ বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচার দীর্ঘদিন না হওয়ায় সমাজে একটি বিপজ্জনক বার্তা ছড়িয়েছে-ক্ষমতা থাকলে  অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। এই সংস্কৃতির ফল আমরা আজও দেখি। ফলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়ে। বুদ্ধিবৃত্তিক ভিন্নমত দমন হয়। প্রশ্নকারী মানুষকে ‘অস্বস্তিকর’ বলে চিহ্নিত করা হয় যা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের চেতনার সম্পূর্ণ বিপরীত। শিক্ষা ও গবেষণায় আমরা এখনও কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারিনি।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বুদ্ধিবৃত্তিক সততা ও নৈতিক নেতৃত্বের সংকট প্রকট অর্থাৎ, যাঁরা আলোকবর্তিকা হয়ে পথ দেখানোর কথা ছিল, তাঁদের শূন্যতা আজও আমরা গভীরভাবে অনুভব করি। এটি আমাদের ব্যর্থতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়।   স্মরণ কি শুধু আনুষ্ঠানিক-   প্রতিবছর ১৪ ডিসেম্বর আমরা ফুল দিই, আলোচনা করি, বিশেষ অনুষ্ঠান দেখি। কিন্তু প্রশ্ন হলো-এই স্মরণ কি আমাদের আচরণে, চিন্তায়, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত হয়। যদি শিক্ষক নির্যাতিত হন,সাংবাদিক সত্য বলার জন্য হুমকির মুখে পড়েন,ভিন্নমতকে রাষ্ট্রবিরোধিতা হিসেবে দেখা হয়,তবে সেই স্মরণ অর্থহীন হয়ে পড়ে।   শেষ কথা হলো যদি দেশকে ভালোবাসি, স্বাধীন দেশে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাই তাহলে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত স্মরণ মানে প্রাণে ধারণ করতে চাই তাহলে- যুক্তি ও মানবিকতার চর্চা,প্রশ্ন করার অধিকার রক্ষা,সাম্প্রদায়িকতা ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান করতে হবে।      আজকের তরুণরা প্রযুক্তিতে দক্ষ, কিন্তু ইতিহাসে প্রায়ই বিচ্ছিন্ন। শহীদ বুদ্ধিজীবীরা পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি লাইনে সীমাবদ্ধ। তাঁদের চিন্তা, মানবিকতা, সাহস-এসব নিয়ে গভীর আলোচনা নেই। যদি আমরা ইতিহাসকে কেবল মুখস্থ বিষয় বানাই, তবে তা চেতনা তৈরি করে না। প্রয়োজন ইতিহাসকে অনুভব করা, প্রশ্ন করা, আত্মস্থ করা।  কারণ যারা প্রশ্ন করতে শেখে না, তারা স্বাধীনতাকেও ধরে রাখতে পারে না।

নতুন প্রজন্ম ও দায়িত্ববোধ বাড়াতে চাইলে অবশ্যই আজকের তরুণ প্রজন্ম অনেকেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নাম জানে, কিন্তু তাঁদের আদর্শ জানে না। পাঠ্যবইয়ে তথ্য থাকলেও গভীর আলোচনা নেই। ইতিহাসকে কেবল মুখস্থ বিষয় বানালে চেতনা জন্মায় না।প্রয়োজন শিক্ষায় মুক্তিযুদ্ধের মানবিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক তুলে ধরা। শহীদ বুদ্ধিজীবীদের লেখা ও চিন্তা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা। ইতিহাসকে প্রশ্নের মাধ্যমে বোঝার সুযোগ তৈরি করা।     পরিশেষে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একটি জাতি শুধু ভূমি নিয়ে স্বাধীন হয় না, চিন্তা ও বিবেক নিয়েই স্বাধীন হয়। ১৯৭১ সালে সেই বিবেককে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। শত্রুরা ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু আমরা যদি সেই চেতনাকে লালন না করি, তবে ব্যর্থতা আমাদেরই। সবসময় মুক্তচিন্তা ও প্রশ্ন করার সংস্কৃতি গড়ে তোলা, শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিকতা ও যুক্তিবোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া। সাম্প্রদায়িকতা, মিথ্যাচার ও অন্ধ আনুগত্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া।

এই কাজগুলো আমরা যতদিন না করি, ততদিন শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কেবল ইতিহাসের পাতায় বন্দী থাকবেন, জীবনের আলো হয়ে উঠবেন না।   প্রতিবছর পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনা সভা ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের মধ্যেই কি আমাদের দায়িত্ব শেষ? যদি স্মরণ কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা শহীদদের প্রতি অবিচার করা হবে।   শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস আমাদের কেবল শোকের নয়, আত্মসমালোচনার দিন। তাদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা যদি আমরা নৈতিকতা, মানবিকতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সততায় রক্ষা না করতে পারি, তবে সেই আত্মত্যাগ প্রশ্নবিদ্ধ হয়—আমাদেরই কারণে। আজ প্রয়োজন স্মরণকে শক্তিতে রূপ দেওয়ার, বিচারকে পূর্ণতার দিকে নেওয়ার এবং একটি জ্ঞানভিত্তিক, মানবিক বাংলাদেশ নির্মাণে শহীদ বুদ্ধিজীবীরা কোনো অতীত নন। তাঁরা আমাদের বর্তমানের ছায়া এবং ভবিষ্যতের মানচিত্র।