খবর প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ১২:২১ পিএম

বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য মার্কিন ভিসা বন্ধ: সিদ্ধান্তের নেপথ্য ও সম্ভাব্য অভিঘাত
আকবর হায়দার কিরণ
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একটি বৈশ্বিক প্রভাবশালী দেশের ভিসা নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন মানেই তা শুধু অভিবাসন ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর অভিঘাত পড়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, শ্রমবাজার এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের ওপর। সাম্প্রতিক খবরে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্তত ৭৫টি দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে ভিসা প্রদান কার্যত স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হতে যাওয়া এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
ফক্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এসব দেশের কনস্যুলার অফিসে নির্দেশনা পাঠিয়েছে—যাতে সাময়িকভাবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। যুক্তি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, এসব দেশের আবেদনকারীরা ভবিষ্যতে মার্কিন সরকারের বিভিন্ন ধরনের সরকারি সহায়তা বা সামাজিক সুবিধার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন। এই সম্ভাবনাকে ঠেকাতেই ভিসা প্রক্রিয়ার কঠোর পুনর্নিরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্তের মূল দর্শন: ‘Public Charge’ নীতির কঠোর প্রয়োগ এই সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে রয়েছে তথাকথিত ‘public charge’ নীতি। অর্থাৎ—যেসব বিদেশি নাগরিক যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর স্বাস্থ্যসেবা, দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, আর্থিক সহায়তা বা অন্যান্য সামাজিক সুবিধার ওপর নির্ভর করতে পারেন বলে মনে করা হয়, তাদের ভিসা না দেওয়ার প্রবণতা। নতুন নির্দেশনায় এই যাচাই-বাছাই আরও বিস্তৃত ও কঠোর করা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। এমনকি বয়স, শারীরিক অবস্থা কিংবা ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যঝুঁকিকেও বিবেচনার আওতায় আনা হয়েছে—যা মানবাধিকার ও বৈষম্য প্রশ্নে নতুন বিতর্ক তৈরি করছে।
বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী বাংলাদেশ এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, পর্যটক, পেশাজীবী ও পরিবার-ভিত্তিক অভিবাসী যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ভিসা স্থগিতের ফলে- উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে পরিবার পুনর্মিলন ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়া দীর্ঘসূত্রতায় পড়বে ব্যবসা, প্রশিক্ষণ ও পেশাগত সফর ব্যাহত হবে এর ফলে শুধু ব্যক্তিগত স্বপ্ন নয়, দুই দেশের জনগণের মধ্যে দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ও সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট ও রাজনৈতিক বাস্তবতা এই সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিবাসন-কেন্দ্রিক কঠোর নীতিরই ধারাবাহিকতা। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, অভিবাসন নিয়ে জনমতের বিভাজন এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের যুক্তি—সব মিলিয়েই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—বিশ্বায়নের এই যুগে, যখন যুক্তরাষ্ট্র নিজেই দক্ষ অভিবাসী, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও বহুজাতিক কর্মশক্তির ওপর নির্ভরশীল, তখন এমন ব্যাপক ভিসা স্থগিতাদেশ কতটা বাস্তবসম্মত? বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন যুক্তরাষ্ট্র অদূর ভবিষ্যতে যৌথভাবে ফুটবল বিশ্বকাপের মতো বৈশ্বিক আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে এবং লক্ষাধিক বিদেশি দর্শকের আগমনের প্রত্যাশা করছে।
সমালোচনা ও উদ্বেগ মানবাধিকার সংগঠন ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা এই সিদ্ধান্তকে অতিরিক্ত কঠোর ও সম্ভাব্য বৈষম্যমূলক বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাদের মতে, পুরো দেশভিত্তিক ভিসা স্থগিতের নীতি ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও বাস্তব অবস্থার ন্যায্য মূল্যায়নের সুযোগ সংকুচিত করে দেয়। এতে যুক্তরাষ্ট্রের বহুত্ববাদী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজব্যবস্থার ভাবমূর্তিও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশসহ ৭৫ দেশের নাগরিকদের জন্য মার্কিন ভিসা স্থগিতের এই সিদ্ধান্ত কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা গভীর হবে, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু নিশ্চিত—এই সিদ্ধান্ত লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন পরিকল্পনা, স্বপ্ন ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ওপর তাৎপর্যপূর্ণ ছাপ ফেলবে। এমন বাস্তবতায় সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতা, সচেতন নাগরিক উদ্যোগ এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনা আগের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে উঠেছে।