সালাহউদ্দিন আহমেদ প্রকাশিত: ১৮ মার্চ, ২০২৬, ০২:৫৩ এএম
.jpg)
নিউইয়র্ক (ইউএনএ): মাহবুবুল হায়দার মোহন মুক্তিযোদ্ধা, গণসংগীত শিল্পী প্রিয় মাতৃভূমির প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার টানেই একদিন হাতে তুলে নিয়েছিলেন অস্ত্র বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন এবং পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাÐে জড়িয়ে যান। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্নাতক এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর প্রথম পর্ব শেষ করার পর তিনি আর পড়াশোনা করেননি। তার চতুর্দশ প্রয়াণ দিবস আগামী ২৩ মার্চ, সোমবার। খবর ইউএনএ’র।
জন্মগতভাবেই মোহনের মধ্যে ছিল সংগীতের প্রতি প্রবল আকর্ষণ। চট্টগ্রাম সংগীত পরিষদের একজন শিক্ষার্থী হিসেবে শুরু করেছিলেন আনুষ্ঠানিক চর্চা। কিন্তু পরবর্তীতে পরিবেশ এবং পরিস্থিতির কারণে তাঁকে এক পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক সংগীত শিক্ষার বিপরীতে প্রতিবাদী সংস্কৃতি চর্চায় মনোযোগী করে তোলে।১৯৭৪ সালে চট্টগ্রামে সম্মিলিত ২১ উদযাপন কমিটি গঠিত হলে তিনি ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠী পুনরায় সংগঠিত করার মাধ্যমে সেখানে বেশ কয় বছর অত্যন্ত মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। নানান প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়েও মোহন এই সমস্ত কর্মকান্ড পরিচালনায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। ১৯৮৩ সাল থেকে মাহবুবুল হায়দার মোহন ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন সময়ের ডাকে সাড়া দিয়ে এই সময় তিনি প্রায় নিস্ক্রিয় ক্রান্তি শিল্পী গোষ্ঠীকে সচল করার কাজে হাত দেন। ১৯৮৪ সালের ডিসেম্বর এ বিখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কাজি বাহাউদ্দিন আহমেদকে আহবায়ক করে সেগুন বাগিচার একটি বাড়িতে ক্রান্তি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করেন। ৬০ সালে ক্রান্তির অন্যতম মূল প্রতিষ্ঠাতা কামাল লোহানী, আমানুল হক এবং অন্যান্যদেরকেও এই প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত করেন। নব গঠিত ক্রান্তি ৮৫ সালে প্রভাত ফেরীর মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে।
এরপর থেকে ক্রান্তির যে অগ্রযাত্রা তা অব্যাহত রয়েছে। গেলো বছর (২০২৫) তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে শ্রদ্ধেয় শিল্পী মলয় কুমার গাঙ্গুলী ‘মাহবুবুল হায়দার মোহন পদক’ প্রদান করা হয়। দেশ বরেণ্য কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী আমৃত্যু ক্রান্তির সভাপতি থেকে এই সংগঠনকে মহিমান্বিত করেন। তাঁর আগে সাইয়িদ মোয়াজ্জেম হোসেনও কিছুকাল ক্রান্তির সভাপতি ছিলেন। কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরীর প্রয়ানের পর মাহবুবুল হায়দার মোহন আমৃত্যু ক্রান্তি’র সভাপতি ছিলেন। মরহুম মোহনের জন্ম কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে। তাঁর পিতা মরহুম আমিন উল্লাহ মজুমদার ব্রিটিশ রেলওয়ের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। বাবার চাকুরীর কারনে তাঁর শৈশব কাটে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। জীবদ্দশায় মুক্তিযোদ্ধা মোহন গান-বাজনা আর সংগঠন করতেই বেশীর ভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন। তিনি নিজের একক অ্যালবাম প্রকাশ করার দিকে কোনদিন নজর দেননি।
তাঁর প্রকাশিত অ্যালবাম এর ভেতর অন্যতম জাগরণের গান ‘আমার ভালোবাসার স্বদেশ’ গণসংগীত ‘লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ ইত্যাদি। তাঁর কণ্ঠে রেকর্ডকৃত কিছু দেশের গান বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল প্রায়ই প্রচার করে থাকে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি থাইল্যান্ড এবং ভারতে চিকিৎসা গ্রহন করেন। তাঁর চিকিৎসার ব্যাপারে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ফকির আলমগীর, আসাদুজ্জামান নূর, নাসির উদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু, গোলাম কুদ্দুস, হাসান আরিফ সহ সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট এবং ক্রান্তির প্রতিটি কর্মী আপ্রাণ চেষ্টা করেন।
মুক্তিযোদ্ধা মোহনের চিকিৎসা সাহায্যার্থে নিউইয়র্কে সাউথ এশিয়ান মিউজিক সোসাইটি বিশেষ বেনিফিট কনসার্টের আয়োজন করে। নিউইয়র্ক বসবাসরত স্বাধীন বাংলা বেতারের কণ্ঠ যোদ্ধা শহীদ হাসানের লেখা এবং সুরে লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে’ গানটি মাহবুবুল হায়দার মোহনের কণ্ঠে ব্যাপক সমাদৃত হয়। বীর মুক্তিযোদ্ধা মাহবুবুল হায়দার মোহনের মৃত্যুবার্ষিকীতে দেশে ও প্রবাসে যথারীতি স্মরণ সভা ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়ে থাকে। তাঁর জন্য মরণোত্তর একুশে পদক প্রস্তাবনা করা হয়েছিলো কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হয়নি বলে জানা যায়। তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত ও শান্তি কামনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সবার দোয়া কামনা করা হয়েছে।