NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬ | ১০ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন কানাডার রাজনীতিতে ডলি বেগমের চমক 'মারকুইস হু’স হু' ফাইন্যান্স খাতে দক্ষতার জন্য বাংলাদেশী আমেরিকান মলি রহমানকে সম্মানিত করেছে সিএনএনের প্রতিবেদন ‘গেম অব চিকেন’: সংঘাতের বিপজ্জনক মোড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, অস্থির বিশ্ব অর্থনীতি শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা -  ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ অবরোধ থেকে সরে আসতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব
Logo
logo

প্রবাসে স্বাধীনতার জন্য দায়বদ্ধতা -অধ্যাপক ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

প্রবাসে স্বাধীনতার জন্য দায়বদ্ধতা -অধ্যাপক ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ

 বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস সমস্ত বাঙালির যেমন গর্বের ইতিহাস, ঐতিহ্যের ইতিহাস, সাহসিকতার ইতিহাস, তেমনি দুঃখেরও ইতিহাস। একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে একটি জাতি। ঘাতে প্রতিঘাতে বিকাশ হয়েছে বাঙালি জাতিসত্তার। আবেগ আর অনুভূতি অহরহই নাড়া দিয়ে যায়। মুক্তিযুদ্ধের মহান অর্জন সব কিছুর ঊর্ধ্বে, বাঙালির সব সময়ই পথ চলার আলোকবর্তিকা।  ১৯৭১-এ যে ভয়ঙ্কর মুক্তিযুদ্ধ মাত্র ৯ মাসের মধ্যে সমাপ্ত হয়েছিল তার বিশালতার পূর্ণ বিবরণ দেওয়া ইতিহাসেরও অসাধ্য। মুক্তির জন্য যে সংগ্রাম শুরু হয়েছিল তা সমস্ত দেশে শুধু সশস্ত্র যুদ্ধ দিয়ে নয়, প্রত্যেক ঘরে ঘরে প্রত্যেক দিন প্রাণের ভয় তুচ্ছ করে ধর্ম ও রাজনৈতিক মতভেদ নির্বিশেষে বাংলার মানুষ তাতে অংশগ্রহণ করেছিল। রক্তের বন্যার ভিতর দিয়ে, লক্ষ কোটি মানুষের বিসর্জনের মূল্য দিয়ে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে স্বাধীনতার পতাকা উড়িয়েছিল — কী অমূল্য ছিল সেই স্বাধীনতা!  বাংলার মানুষ যে অসাধ্য সাধন করার মন্ত্রে একদিন ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল আজকের দিনে আবার তার প্রতিফলনের অঙ্গীকারের সময় এসেছে। বাংলাদেশ আজ এক যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। শুধু খণ্ডিত নয়, এখন মুক্তিযুদ্ধের পূর্ণ ইতিহাস তুলে ধরার আজ প্রয়োজন অনিবার্য। বিশেষ করে ২০২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থানের ভিতর দিয়ে একটি কথা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে বহু বছরের রাজনৈতিক অবক্ষয় আর সংকীর্ণতায় স্বাধীনতার ইতিহাস বাংলাদেশের প্রজন্মদের কাছে তুলে ধরা হয়নি। তাই তাদেরকে অজ্ঞতা আর স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির মিথ্যা প্রচারণার বিরুদ্ধে শক্তভাবে ইতিহাস তুলে ধরতে হবে।  ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ যখন হঠাৎ করে ভারত ভাগ করে ধর্মীয় বিভাজনের ভিতর দিয়ে পাকিস্তান আর হিন্দুস্তান বানিয়ে দিল তখন বাঙালি মুসলমানেরা সংগত কারণে পাকিস্তানের অংশ হয়েছিল। তারপর ২৩ বছর পশ্চিম পাকিস্তানের ক্রমাগত শোষণ আর অত্যাচারে বাংলায় অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠে আর শুরু হয় প্রতিবাদ।  মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তাই দুই ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত রাজনৈতিক সংগ্রাম। শুরু হয় বহু বাঙালির নেতৃত্বের ত্যাগ আর সংগ্রামের পরে জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়। বহু ত্যাগ আর কঠিন সময়ের পরে এক সময় শেখ মুজিব চলে আসেন এই সংগ্রামের পুরোভাগে। তাই ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন জয়লাভ করে জাতির ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে আনার অঙ্গীকার করে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক সরকার ক্ষমতা হস্তান্তর না করে অতর্কিতে ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ সমস্ত দেশে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। বন্দি করে বঙ্গবন্ধুকে।নির্বাচনে জয়লাভ করেও এই বিশ্বাসঘাতকতার জন্য প্রস্তুত না থাকায় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দসহ এক কোটি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নেন। তখন শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের সামরিক সংগ্রাম। বাংলাদেশে অবস্থিত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকরা বিদ্রোহ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। এপ্রিলের ৪ তারিখ সিলেটের তেলিয়াপাড়া চা বাগানে কর্নেল উসমানীকে যুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বানিয়ে দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে পুলিশ, বর্ডার গার্ড (ইপিআর) এবং পরে সর্বস্তরের মানুষের সমন্বয়ে যুদ্ধে মরণপণ আত্মত্যাগের জন্য গড়ে ওঠে মুক্তিফৌজ। শরণার্থীদের আশ্রয় আর মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্র এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য ভারতের সরকার এবং সাধারণ মানুষের সহায়তা ছিল তুলনাহীন। নয় মাস অবিরাম যুদ্ধে, ত্রিশ লক্ষ শহীদ আর সমস্ত দেশে ধ্বংসস্তূপ হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে সম্পূর্ণ ধরাশায়ী হয় পাকিস্তানিরা। পালাবার পথ খুঁজছিল। ঠিক তখন ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় সৈন্যরা মুক্তিবাহিনীর সাথে যৌথভাবে শেষ ১৩ দিনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। সহজেই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। স্বাধীন হয় বাংলাদেশ।এই স্বাধীনতা ছিল সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগ আর স্বপ্নের ফসল। কিন্তু রাজনৈতিক মতবিরোধ, হিংসা আর অন্যায়ের জন্য যে সরকারই এসেছে সবাই খণ্ডিত ইতিহাস অথবা মিথ্যা ইতিহাস বানিয়ে এই মহান অর্জনকে অবমূল্যায়ন করেছেন। এমনকি ভারতও আজকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ বলে অভিহিত করে। ঐ সময়ে ভারতের সহায়তার জন্য বাঙালিরা যেমন কৃতজ্ঞ থাকবে তেমনি তাদের চিরশত্রু পাকিস্তানকে খণ্ডিত করার জন্য ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত বাংলাদেশে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসিকতার জন্য তাদেরও বাংলাদেশের কাছে কৃতজ্ঞ থাকা দরকার। আজকে বাংলাদেশ-ভারতের যে বিরোধ তাতে এই সত্যের উপলব্ধি দুই দেশের মাঝে একটি সম্মানের জায়গা তৈরি করতে সহায়তা করতে পারে।  উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। নতুন দেশে জীবনের ব্যস্ততা আর মিশ্র সংস্কৃতির চাপে বেশির ভাগ মানুষ দিশেহারা।তবে কিছুসংখ্যক মানুষ সাহসী। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে নিজের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে বুকের কাছে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। এখানে অসংখ্য নতুন প্রজন্মের অগ্রযাত্রার বিস্ময় আমাদের গৌরবের বিষয়। তবে এই বিশ্বায়নে নিজেদের মূল্যবান ঐতিহ্য ও মহান ইতিহাসের মূল্যবোধ ও স্বকীয়তা তাদের না শেখালে বৃন্তচ্যুত ফুলের মতো তারা কোথাও ভেসে যাবে; আর আমরা অনন্তকালের কাছে তার জন্য দায়ী থাকব।  প্রবাসে তাই যতদিন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের কথা, বঙ্গবন্ধুর কথা, বাঙালি সৈনিকদের কথা, নিরলস রাজনৈতিক নেতৃত্ব আর লক্ষ লক্ষ শহীদদের কথা, শহীদ পরিবারের বেদনার কথা, মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, সাধারণ মানুষের সংগ্রাম আর দুঃখের কথা আমরা স্মরণ করব ততদিন বাঙালিরা মাথা উঁচু করে রাখার শক্তি পাবে।  প্রবাসে আমাদের ব্যবহার ও আত্মমর্যাদা, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে মানুষকে সম্মান দেওয়ার আলোকে অন্যরা আমাদের ঐতিহ্য, ধর্ম ও আমাদের সংস্কৃতিকে সম্মান করতে জানবে। না হলে আমরা বিপজ্জনকভাবে সম্মানের অধিকার হারাব। আমেরিকার বর্তমান সরকারের অভিবাসীবিরোধী মনোভাবকে প্রতিহত করার একমাত্র পথ হচ্ছে একজন সুনাগরিক হয়ে ভুলভ্রান্তি বা বোঝা না হয়ে এদেশের উন্নতির জন্য সচেতন হয়ে সচেষ্ট হওয়া।

 স্বাধীনতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন হবে যদি আমরা জাতির স্বপ্ন পূরণে এগিয়ে যাই; আর আমাদের মুক্তির জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষের আত্মাহুতিকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি। তাদের বিশ্বাস ভঙ্গ না করার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করি। সম্মিলিত বা দলগতভাবে না পারলেও, নিজস্ব অবস্থান থেকে একলাই যেন সেই আদর্শকে ধারণ করতে পারি। প্রবাসে থাকার জন্য আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে আমাদের আরও কিছু দায়িত্ব বেড়ে গেছে। নিজে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধা আর মহান শহীদের সন্তান হওয়া হয়তো আরও কিছু তাড়নায় ব্যতিব্যস্ত করে রাখে।  ১৯৮০ সালে আমার আমেরিকাতে আসার পর প্রেসিডেন্ট এরশাদের আমলে (যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে ছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধের কথায় বিব্রত হতেন) মুক্তিযুদ্ধের কথা মানুষ কম আলাপ করত, আর প্রজন্মরা বাংলাদেশে শিক্ষাঙ্গনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস শিখত না, তাই একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছিল।  ফিলাডেলফিয়ায় ১৯৮৪ থেকে আমরা স্বাধীনতা আর ভাষা আন্দোলনের উপর নিয়মিত অনুষ্ঠান করতাম। ১৯৯০ সালে মুক্তিযুদ্ধে বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা প্রদান করি। তখন পাকিস্তানি জাহাজে আমেরিকার অস্ত্র দেওয়ার বিরুদ্ধে যে ঐতিহাসিক ঘটনা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল সেই "ব্লকেইড" বইয়ের কাহিনি নিয়ে ডকুমেন্টারি বানিয়ে প্রচার করেছিলাম।

১৯৮৫ থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধের জাগরণী গান ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরোচিত মুহূর্ত ও সীমাহীন বর্বরতার অসংখ্য ছবি সমন্বয়ে মুক্তিযুদ্ধের উপর স্লাইড শো বানিয়ে নিউইয়র্কে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করার জন্য ফিলাডেলফিয়া থেকে প্রায়ই ছুটে যেতাম: দর্শকদের চোখ চিকচিক করে উঠত, কারও কারও চোখে জল, আর স্মৃতিতে নাড়া দিত বুকের ভিতর সুপ্ত সেই বিশাল আত্মপ্রত্যয়ের ঘটনাগুলি। তাছাড়া বাংলা ভাষা আর ঐতিহ্য ধারণ করার জন্য অনেক স্লাইড শো ডকুমেন্টারি বানিয়ে প্রদর্শন করতাম। তার মধ্যে বাংলা কবিতার উৎপত্তি, ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, মৌলানা ভাসানী, লালন ফকির, হাসন রাজা, সুকান্ত, জীবনানন্দ দাশ প্রমুখের জীবন ও দর্শনের উপর ডকুমেন্টারি বানিয়ে প্রচার করতাম। তাছাড়াও পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কে মুক্তধারা বইমেলার কনভেনর, মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি, উত্তর আমেরিকা কাজী নজরুল ইসলাম সম্মেলনের সহ-সভাপতিসহ বহু সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। প্রতি বছর বাংলাদেশে মেডিকেল মিশন নিয়ে বহু শিক্ষা ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে তৎপর। বাংলাদেশের সিলেটে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালের স্বপ্নদ্রষ্টা আর প্রতিষ্ঠাতা যেখানে আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসা এবং বিনামূল্যে ডায়ালিসিস সেবা দেওয়ার অঙ্গীকারে দায়বদ্ধ।

 ধীরে ধীরে সময়ের পরিবর্তন হলো, লোকারণ্য হলো লোকালয়, বাঙালির জাগরণে আজ নিউইয়র্কসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রতিফলিত হয় বাংলার সংস্কৃতি, সাহিত্য আর মুক্তিযুদ্ধের কথা। ২০০৫ সালে আমেরিকা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে আমেরিকার পাকিস্তানি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন আমাকে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাদের সম্মেলনে যোগ দিতে আমন্ত্রণ জানাল। ভারতীয় মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতিও থাকবেন। আমি বললাম, আমি নিশ্চয়ই যাব, তবে আমি বাংলাদেশে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ১৯৭১ সালের গণহত্যার কথা তুলব। পাকিস্তানি সভাপতি ঘাবড়ে গেলেন ও বললেন, এই বিষয় কি এই জায়গায় তোলা সমীচীন হবে? আমি বললাম, তাহলে তো যাওয়া হবে না। এক সপ্তাহ পরে পাকিস্তানি মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফোনে আমার কথায় তার কমিটি রাজি হয়েছে বলে জানালেন।

কিছুদিন পরে ওয়াশিংটন ম্যারিয়ট হোটেলে অনুষ্ঠানে দেখি আমাদের জন্য বিরাট সুইট রিজার্ভ করা হয়েছে। সান্ধ্য ডিনারের পরে অনুষ্ঠান শুরু। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত, একজন মন্ত্রী, আমেরিকান তিনজন সিনেটরসহ আরও কিছু বিশেষ ব্যক্তিত্ব নিয়ে সাড়ে তিন হাজারের মতো ডাক্তার ও তাদের পরিবার দিয়ে ভর্তি ছিল ডিনার হল।  অনুষ্ঠানের প্রথম দিকে ভারতীয় সহ-সভাপতি তার বক্তৃতায় আমেরিকাতে এশিয়ানদের সাথে ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ও কিছু হাসপাতালের বৈষম্যমূলক ব্যবহার ও একসাথে তার প্রতিকার করার উপর আলোচনা করেন। আমাকে পরিচিত করার আগে পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে বললেন পাকিস্তানি সৈন্যরা ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনে জয়লাভ করার পরও ক্ষমতা না দিয়ে যে গণহত্যা করেছিল তার সত্যতা মানুষদের কাছে পৌঁছাতে দেয়নি।

পরে পাকিস্তানি অনেক নেতৃত্ব ও বুদ্ধিজীবী প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন এবং জেলও খেটেছেন। তারপর কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের একটি উর্দু কবিতা আবৃত্তি করলেন: তাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী কর্তৃক সহোদর নিজ দেশে বাঙালিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে ছিল আবেগময় জোরালো কণ্ঠ।  তারপর তিনি বললেন, আপনারা জেনে খুশি হবেন আমাদের মাঝে আজকে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়েছেন উত্তর আমেরিকা বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। বলতেই অবাক হয়ে দেখি আমি স্টেজে উঠা পর্যন্ত সমস্ত হলভর্তি মানুষ দাঁড়িয়ে তালি দেওয়া শুরু করল। মনে হলো এদের সবাই শিক্ষিত হওয়ার জন্য হয়তো অন্ধ হয়ে যায়নি। ইতস্তত না করে শুরু করলাম পাক-ভারত মহাদেশের এক ক্রান্তিলগ্নে (তখন পাকিস্তান ও ভারত আণবিক বোমা নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে) নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানাবার জন্য এবং সম্মান জানাবার জন্য ধন্যবাদ।

তবে আজ জানাতে এসেছি যে পাকিস্তানি মিলিটারি ও ভুট্টোর রাজনৈতিক দলের সহায়তায় আমাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ন্যায্য অধিকার দেওয়ার পরিবর্তে ৩০ লক্ষ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা, নারী নির্যাতন এবং সমস্ত দেশে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছিল। দুঃখের বিষয় আমাদের এই ইতিহাস আজও পাকিস্তানের কাছে উপেক্ষিত। আজকে এখানে আসা তখনই সার্থক হবে যখন সরকার এবং সাধারণ পাকিস্তানিরা আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে স্বীকার করে গণহত্যার জন্য অনুতপ্ত হয়ে ক্ষমা চাইবে।  প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ১০০ মিলিয়ন মানুষকে হত্যা করার পরও আজকে ইউরোপ, জাপান ও রাশিয়া বন্ধুত্ব করেছে। কারণ জার্মানি ও জাপানিরা তাদের পূর্বসূরির অমানুষিক হিংস্রতার জন্য ক্ষমা চেয়েছিল। আমি বললাম, আমার বাবা ১৯৪৭-এ পাকিস্তান হওয়ার পর ভারতের করিমগঞ্জে নিজ পূর্বপুরুষের ভিটা ছেড়ে পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন দেশ গড়ার জন্য।

তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সেক্রেটারি, প্রথম রিলিফ অর্গানাইজেশন পাকিস্তান অ্যাম্বুলেন্সের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি, শেষ সময়ে সিলেট মেডিকেল কলেজের অধ্যাপক এবং সার্জারির প্রধান ছিলেন, সারা জীবন মানুষের সেবার জন্য বিভিন্ন কাজ করে গেছেন, কোনো দিন রাজনীতি করেননি। তোমাদের সৈন্যরা এপ্রিল মাসের ৯ তারিখে তোমাদের আক্রমণে যখন জনশূন্য সিলেট শহর অথচ হাসপাতালভর্তি গুলিবিদ্ধ রোগী, তখন সব ডাক্তার পালিয়ে গেলেন, অথচ তিনি তার একজন ইন্টার্ন, একজন অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার ও একজন পুরুষ নার্স নিয়ে জীবনের ভয় তুচ্ছ করে সেবার মহান ব্রতে রয়ে গেলেন। আর এই অবস্থায় পাকিস্তানি সৈন্যরা হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে তাদের হত্যা করে। তোমরা কীভাবে আশা করো — আমরা এমনিতেই এইসব ভুলে যাব, ও তোমাদের বন্ধু হয়ে যাব?  

এই উপমহাদেশে শান্তির জন্য একতা প্রয়োজন এবং আমরা আমেরিকা থেকে সেই লক্ষ্যে কার্যক্রম শুরু করতে পারি। আমার বক্তৃতার পরে আমার সাথে হাত মেলাবার জন্য লম্বা লাইন পড়ে। একটি মেয়ে জোর করে এগিয়ে এসে বললেন: আমার মা একজন মিলিটারি জেনারেলকে থাপ্পড় মেরেছিলেন, কারণ তিনি বড়াই করে বাংলায় হত্যার কথা বলছিলেন। জিজ্ঞেস করা হয়নি কে তার মা। অনেকেই বুকে জড়িয়ে বললেন আপনি ঠিক কথা বলেছেন, আমাদের অনেক অন্যায় হয়েছে।  একজন প্রবীণ সৌম্যকান্তি পুরুষ বললেন, আমি রাজনীতিবিদ আহমেদ খান কাসুরি। আমি ভুট্টোর দল থেকে ১৯৭০ নির্বাচনে লাহোর থেকে সাংসদ হই এবং আমি ভুট্টোর শয়তানি টের পেয়ে তার বিরোধিতা করে ১৯৭১-এ শেখ মুজিবের অধিবেশনে শরিক হওয়ার জন্য ঢাকায় আসি। ভুট্টো আমাকে প্রচণ্ডভাবে তিরস্কার করতে থাকে তথাপি আমি ঢাকায় থাকি এবং ২৫শে মার্চের মিলিটারিদের আক্রমণের পরে মন খারাপ করে শেষ প্লেনে করে লাহোর আসি। এরপর থেকে আমি ভুট্টোর সমালোচনায় মুখর হই।

১৯৭৪ সালে ভুট্টোর লোকজন আমাকে হত্যা করার জন্য গভীর রাত্রে ফেরার সময় আমার গাড়িতে গোলাবর্ষণ করে এবং আমার বাবা নিহত হন। আমি ভুট্টোর বিরুদ্ধে মামলা রুজু করি। ১৯৭৭ সালে, ভুট্টোকে সরিয়ে ক্ষমতায় আসা জিয়াউল হকের সামরিক সরকার ভুট্টোকে ফাঁসি দেয়। আমি অবাক বিস্ময়ে কাসুরির দিকে তাকিয়ে থাকি। তিনি বলেন, তোমরা ভালো করেছ স্বাধীনতা অর্জন করে। এদিকে ওহাইওর মার্কিন সিনেটর আমার হাত ধরে বললেন, আপনি তো দারুণভাবে নাড়া দিয়ে গেলেন।  আমার তখন মনে হলো, আমেরিকাতে থাকার জন্য এবং মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আমার এই কাজটি করার সুযোগ হয়ে গেল। পরে শুনেছি — এই খবর পাকিস্তানের পত্রিকায়ও ছাপা হয়েছিল। পরের বছর আমাদের অনুষ্ঠানে পাকিস্তান এবং ভারতীয় সভাপতিদের আমন্ত্রণ জানাই।

পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থেকে বললেন — আমি পাকিস্তানের মিলিটারি দ্বারা ১৯৭১ সনে বাংলাদেশে যে গণহত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ সাধিত হয়েছে তার জন্য আপনাদের কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছি। অনেক দিন পারিনি। আমাদের নামে তারা আপনাদের যে অসাধারণ ক্ষতি করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। আপনাদের কোনো দুঃখ আমি কমাতে পারব না — তা জানি। তবু আমাদের অজ্ঞতা ও অযোগ্যতার জন্য ক্ষমাপ্রার্থী।  বাংলাদেশি সব ডাক্তার দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাকে অভিনন্দন জানালেন। ভারতীয় সভাপতি অত্যন্ত অভিভূত হয়ে বললেন, মনে হচ্ছে এই সম্মিলিত চিকিৎসক সমাজের চেষ্টায় আমরা উপমহাদেশে শান্তির পথ খুঁজে পাব। মুক্তিযুদ্ধের বিশাল গণহত্যা আজ সারা বিশ্বের কাছে অজানা। ২০০৮ সালে নিউজার্সির কেইন বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত আরিফ নামের একজন বাংলাদেশি তরুণ তার বন্ধুবান্ধব ও ফারুক চৌধুরী নামক একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রারের সাথে মিলে বাংলাদেশের গণহত্যাকে বিশ্বের হলোকাস্ট স্টাডিতে যুক্ত করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে অনুরোধ করে।

সেইজন্য অনেক তথ্যসামগ্রী উপস্থাপন করতে হয়। ডঃ নুরুন্নবী এবং ফারুক চৌধুরীর অনুরোধে আমাকে শহীদ পরিবারের উপস্থিতি এবং জবানবন্দির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ধারেকাছের পরিচিত শহীদ পরিবারের কেউই নতুন করে বুকে ধরে রাখা দুঃখকে সবার সম্মুখে আবার তুলে ধরতে নারাজ। সমস্ত জীবন শহীদ পরিবার বাংলাদেশের কাছে তুচ্ছ সহানুভূতি ছাড়া আর কিছুই পাননি।  অনেক বোঝানোর পরে ১৫টি শহীদ পরিবারের লিখিত ইতিহাস সংগ্রহ করলাম। সাত-আট পরিবার উপস্থিত হলেন তবে অনেকেই কিছু বলার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট অভিভূত হয়ে পরের বছর আরও বড় করে কনভেনশনটি করার দায়িত্ব নিলেন। ২০০৯ সালে বিরাট সম্মেলনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতসহ আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য থেকে অনেকেই যোগ দিলেন, অনেক আমেরিকান যুদ্ধাপরাধ কর্মী এবং অ্যাটর্নি তথ্যপূর্ণ বক্তব্য দিলেন।

ঢাকা থেকে মফিদুল হক, শাহরিয়ার কবিরসহ অনেকে যোগ দিলেন।  বাংলাদেশের গণহত্যার উপর সারাদিনব্যাপী এই সম্মেলনের পরে কেইন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের গণহত্যা হলোকাস্ট স্টাডিতে অন্তর্ভুক্ত হলো। শহীদ পরিবারের এই সব তথ্য সংগ্রহ করতে একটা প্রচণ্ড ধাক্কা খেলাম। আমেরিকাতে পাওয়া এই ১৫টা শহীদ পরিবারের জীবনের দুর্ভোগ ছিল অবর্ণনীয়। তিন পরিবারের মায়ের মস্তিষ্ক বিকৃত হয়ে গিয়েছিল, দুই পরিবার অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেনি, আত্মীয়রা শিশু সন্তানদের মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে জটিলতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন — এ রকম কত হৃদয়গ্রাহী অজানা ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শহীদ পরিবারের বেঁচে থাকার আপ্রাণ যুদ্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে আজও লিপিবদ্ধ হয়নি।  পরবর্তী পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার শহীদ পরিবার আর বাংলাদেশের মানুষের জন্য একটি অধ্যায়ের কিছুটা সমাপ্তি হতে পেরেছিল।

তবে কথা ছিল যুদ্ধাপরাধী হাজারো পাকিস্তানি মিলিটারিদেরও বিচারের জন্য উদ্যোগ নেওয়া হবে, কারণ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীই আসল যুদ্ধাপরাধী এবং তাদের হুকুমে ও ছত্রছায়ায় বাঙালি যুদ্ধাপরাধীরা গণহত্যায় সহায়তা করেছিল।  আজও শহীদ পরিবারের অনেকেই পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। ধর্মীয় রাজনীতির ভিতরে লুকিয়ে থেকে বাংলাদেশের অনেক বিরোধী শক্তি ধর্মীয় মনোভাবাপন্ন তরুণদেরকে ভুল ইতিহাস শিখিয়ে স্বাধীনতার বিপক্ষ ধারায় নেওয়ার পাঁয়তারা করতে পেরেছিল, তবে সত্য ইতিহাস জানার পরে সেই বলয় থেকে অনেকেই বেরিয়ে আসবে। প্রবাসী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব অনেক। তাই সম্মিলিতভাবে আমাদের গৌরব, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের শিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার অঙ্গীকারের দিন আজ।  অধ্যাপক ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ - কিডনি বিশেষজ্ঞ, টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়, ফিলাডেলফিয়া, এমেরিটাস অধ্যাপক ড্রেক্সেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ অব মেডিসিন। প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রাক্তন সভাপতি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা।