NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২৩, ২০২৬ | ১০ বৈশাখ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য হুমায়ূন কবীর ঢালীর কাব্যসংকলন ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা’ People-Centered Presence  Where are the connections with the diaspora, Bangladesh’s informal envoys? স্টুডেন্ট ভিসাধারীদের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর বার্তা Questions in the Diaspora Over Bangladesh’s Representation at the United Nations জাতিসংঘে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রবাসে প্রশ্ন কানাডার রাজনীতিতে ডলি বেগমের চমক 'মারকুইস হু’স হু' ফাইন্যান্স খাতে দক্ষতার জন্য বাংলাদেশী আমেরিকান মলি রহমানকে সম্মানিত করেছে সিএনএনের প্রতিবেদন ‘গেম অব চিকেন’: সংঘাতের বিপজ্জনক মোড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান, অস্থির বিশ্ব অর্থনীতি শহীদ ডাঃ শামসুদ্দিন আহমেদ : একটি আলোকবর্তিকা -  ডাঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ অবরোধ থেকে সরে আসতে যুক্তরাষ্ট্রকে চাপ দিচ্ছে সৌদি আরব
Logo
logo

একাত্তরে শিশু ও একটি যুদ্ধ  - নন্দিনী লুইজা


আকবর হায়দার কিরণ   প্রকাশিত:  ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৭:০৫ পিএম

একাত্তরে শিশু ও একটি যুদ্ধ  - নন্দিনী লুইজা

এই লেখাটি কোনো সামরিক গোয়েন্দা নথি নয়, কেবল একটি শিশু-চোখে দেখা যুদ্ধের সত্যিকারের বর্ণনা। বয়স তখন মাত্র চার বছর আট দিন। বয়স এত কম যে যুক্তি বোঝার ক্ষমতা ছিল না, কিন্তু আতঙ্কের গন্ধ, মানুষের ছুটোছুটি, গুলির শব্দ, আর অদ্ভুত নীরবতা সবই স্পষ্টভাবে মনে রয়ে গেছে।  বগুড়া-তখন একটি ব্যস্ত শহর, আবার একই সঙ্গে প্রবল ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু। ব্যাংক ডাকাতি, লুটপাট, মানুষ পালিয়ে বেড়ানো-সব মিলিয়ে বগুড়া হয়ে উঠেছিল এক আগুনঝরা অধ্যায়। আর সেই দৃশ্য আমি দেখেছি এক শিশুর চোখে।   বগুড়ার রাত ২৫ মার্চের নীরবতা আর লুকোনো চিৎকার ২৫ মার্চের বিকেলে পুরো বগুড়া শহর অদ্ভুত নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। সাধারণ দিনের মতো মানুষের হাঁকডাক নেই, দোকানপাটের কোলাহল নেই, রাস্তার ধুলোও যেন নড়ে না। বিকেলের পরই ঘোষণা-১৪৪ ধারা। বড়রা মুখচোরা গলায় বলছেন, “বাইরে যাস না। আলো কমিয়ে রাখ।” আমাদের ঘরের জানালার ফাঁক দিয়ে যে রাস্তাটা দেখা যেত, সেটি সেদিন ছিল সম্পূর্ণ শূন্য।  কিন্তু নীরবতার ভেতরেও ভয় লুকিয়ে ছিল,ভয়ই ছিল প্রধান দৃশ্য। পাশের বাড়ির চাচা দরজা বন্ধ করতে গিয়ে বললেন,“আজ রাতটা নিরাপদ নয়। ভোর পর্যন্ত জানি না কী হয়।”বগুড়া শহর তখন আতঙ্কে ডুবে যাচ্ছে, কিন্তু শিশুমনে তা শুধু এক অদ্ভুত দমবন্ধ অন্ধকার বলে মনে হচ্ছিল।শহর যেন যুদ্ধক্ষেত্র।২৬ মার্চের সকালটা ছিল আরও ভয়ানক। মানুষের মুখে মুখে খবর-“গোলাগুলি শুরু হয়েছে।”আমি খুব চঞ্চল ছিলাম বাহিরে যেতে দিচ্ছে না তা বেশ মনে আছে। বগুড়ার মুড়লে “ব্যাংক ডাকাতি হয়েছে!” গ্রামের লোকসহ শহরের“একদল লোক লুট করছে।”  যুদ্ধের বিশৃঙ্খলায় বগুড়ার ব্যাংকগুলো তখন নিরাপদ ছিল না। ডাকাতরা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ব্যাংক লুট করছিল। কেউ বলছিল-“ওরা পাকিস্তানি হানাদারদের সঙ্গে লুট করছে,” আবার কেউ বলছিল-“লোকজন টাকার খোঁজে জীবন বাজি রাখছে।” শুনেছি এই ঘটনার পর বগুড়া শহরের অনেকেই নব ধনী হয়েছিল। তাদের দাপটে আজও তাদের নেতৃত্বে কাজ চলে।

আমাদের বাড়ির পাশের রাস্তায়ও মানুষের দৌড়, থমথমে চোখে আতঙ্ক-এসব দেখেছি। শিশুমনে মনে হয়েছিল, শহরটা যেন হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।   আব্বাজি তখন ঘর থেকে বারবার বাইরে তাকাচ্ছিল। মাঝে মাঝে দরজা বন্ধ করে গভীর শ্বাস ফেলতো। তাঁর উদ্বেগ বুঝতাম, যদিও তখনো বুঝতাম না রাজনীতির অর্থ বা যুদ্ধের বাস্তবতা।  পরদিন থেকে ২৬ মার্চ শুরু হলো ৭ মার্চে ঘোষণা দেওয়া স্বাধীনতার যুদ্ধ। নিরাপত্তার জন্য আমরা সরে গেলাম বগুড়ার শিকারপুরে। অন্ধকার দিনগুলো কাটানোর প্রয়োজনে। জায়গাটি কিছুটা নিরিবিলি, গ্রাম-গন্ধমাখা, কিন্তু সে সময় চারদিকে একই আতঙ্ক। শিকারপুরের রাতগুলো ছিল আরও অন্ধকার। লোকজন বলত,“লাইট নিভিয়ে রাখো। বাইরে যেও না। অস্ত্রধারীরা রাতে ঘোরে।” আমি ঘুমোতে পারতাম না। মাঝে মাঝে মনে হতো, জানালার পাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।  আম্মাজি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে বলতেন-“ভয় পাবি না, আমি আছি।”প্রতিদিন রাতে কেবল দূরের গুলির শব্দ, কখনো আবার নিরবচ্ছিন্ন নীরবতা- যা আরও ভয় জাগাত।     শিকারপুরে আমরা ছাড়াও আরো অনেক পরিবার আশ্রয় নিয়েছিল। তারা এতটাই মানবিক সবাইকে আশ্রয় দিয়েছিল, বলেছে একসঙ্গে থাকবো । আমাদের সঙ্গে আমাদের আত্মীয় সমতুল্য চাচি আম্মারাও ছিলেন। আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো একসূত্রে গাঁথা হয়েছিল আপনের আপন। সবাই সবার পাশে দাঁড়াচ্ছিল। সবাই পালা করে রান্না করতেন। তখন রান্না করাটাও ঝুঁকিপূর্ণ ছিল, কারণ আগুনের আলো দূর থেকে দেখা যেতে পারে। তাই মাটির হাঁড়ি, কাঁঠালপাতা, অল্প আগুন-এইভাবে খাবার তৈরি হতো।লোকজন বলত,“আজ তোমাদের ঘর থেকে খাই, কাল আমরা দেব।”সেই সময় মানুষ কেমন মানুষ হয়ে ওঠে-তা নিজের চোখে দেখেছি।    আব্বাজির উদ্বেগ দেশ স্বাধীন হলে শ্রমিকদের কী হবে?যুদ্ধের বিশৃঙ্খলার মাঝেও আমার আব্বাজি ভেবেছিল কেবল নিজের জীবন নয়-নিজের প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ।তাঁর একটি কারখানা ছিল, যেখানে মেশিন ছিল, মানুষ ছিল। কেউ নষ্ট করে দিলে সব হারিয়ে যাবে।  তাদের পরিবার কীভাবে চলবে?  এই চিন্তায় আব্বাজি প্রতিষ্ঠানের মূল্যবান মেশিনগুলো বিভিন্ন জায়গায় লুকিয়ে রাখতে শুরু করলেন।  আমি দেখেছি-রাতে তিনি হাতে লণ্ঠন নিয়ে বাইরে যাচ্ছেন, শ্রমিকদের সঙ্গে কিছু একটা লুকিয়ে রাখছেন, তারপর নিঃশব্দে ফিরে আসছেন।  আম্মাজি জিজ্ঞেস করলে বলতো,“মেশিনগুলো রক্ষা করতে হবে। দেশ স্বাধীন হলে এদের তো আবার কাজে লাগবে।

আমার শ্রমিকরা রাস্তায় দাঁড়াবে কীভাবে?”  একটি যুদ্ধের সময়ে মানুষ সাধারণত নিজের নিরাপত্তা, নিজের পরিবার-এইগুলোই আগে ভাবে। কিন্তু আব্বাজি ভাবছিল তাঁর কর্মচারীদের জীবন নিয়ে।   তখন আমার আম্মাজি ছিল সন্তানসম্ভাবা। সে বলত যদি বিপদ ঘটে একজন মায়ের ও সন্তানের  কিন্তু জাতিকে রক্ষা করতে গেলে কল কারখানার ভাবনা ভাবতে হবে। এটা আজও আমার স্মৃতিতে আলো হয়ে আছে।আমার ভিতরে এভাবেই দেশপ্রেম সমুজ্জ্বল।    ভয় আর দৌড়ঝাঁপের মাঝেও আমার জন্মদিন এল। নানাভাই আমার আম্মাজি কে নেওয়ার জন্য বগুড়ায় আসেন। এসময় আমার জন্ম দিন। যুদ্ধের সময় জন্মদিন মানে কিছুই নয়, কিন্তু সেদিনের কিছু মুহূর্ত আজও মনকে স্পর্শ করে। নানাভাই এসেছিলেন,তাঁর আসাতে বাড়িটা যেন একটু আলো পেল। তিনি বগুড়া নিউ মার্কেট থেকে আমার জন্য অনেক কিছু কিনে এনেছিলেন।তারমধ্যে একটি গোলাপি রঙের পুতুল ছিল চাবি দেওয়া,অনেক সুন্দর। হয়তো একটা খেলনা, হয়তো একটা ক্লিপ। আমি বুঝিনি তা কী, কিন্তু সেই উপহারের মধ্যে ছিল নানার স্নেহের সেরা অংশ।   আরও একটা কথা খুব মনে পড়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পরই আব্বাজির পরিচিত যুবক তালুকদারের ছেলে আব্বাজির কাছে এসে রাইফেলটা চেয়েছিল। শিশুমনে তখন রাইফেল মানে শক্তি, বীরত্ব।

 আব্বাজি ঐ কথায় কেঁপে উঠেছিল। তাঁর চোখে আতঙ্ক নেমে এলো। তিনি কিছু না বলেই চুপচাপ রাইফেল দিয়ে দিয়েছিল। তখন পরিবেশটা ছিল গ্রীষ্মের আগমন। গাছে গাছে আমের মুকুল, কাঁঠালের মোচা ধরেছে সে এক অপূর্ব দৃশ্য তার মধ্যে দেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। তখন বুঝিনি,আজ বুঝি-যুদ্ধের ভয় মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে নিজের সন্তানও কখনো অজান্তে তার গভীর ব্যথায় আঘাত করে ফেলে। লুটপাট, মানুষের দুর্দশা, অস্থির সময় বগুড়ার মানুষ তখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে ছিল। আম্মাজিকে নিয়ে ব্যস্ত ফলে আশেপাশের মানুষই আমাদের পুরো বাড়িটা লুট করে নিয়ে যায় যা আমরা পরবর্তীতে জেনেছিলাম।   প্রতিদিনে শুনতাম-“আজ অমুক ব্যাংকে লুট!”  “অমুক রাস্তা দিয়ে যেতে দিচ্ছে না!”  “লোকজন নৌকা পাচ্ছে না! পালানোও কঠিন!”  শহর, গ্রাম, হাট-বাজার-সব জায়গায় এক ধরনের উত্তেজনা, ভয়, ক্ষুধা, ও টিকে থাকার চেষ্টা।   আব্বাজি রাতে মেশিন লুকাতো, দিনে শ্রমিকদের খোঁজ নিতো, আম্মাজি ছোট্ট আমাকেই বারবার কোলে টেনে নিচ্ছে“বাইরে যাস না, শব্দ করিস না।”একটি শিশু তখন নিজের ভাষায় বুঝত কেবল একটা জিনিস-সারা দেশ অস্থির।এর মাঝে ঘর আলো করে আম্মাজির জোঠোর ভেদ করে ছোট ভাই এর জন্ম। আমি অত বুঝি না তবে আমার পুতুল খেলার জীবন্ত সামগ্রী নিয়ে ব্যস্ত সারা দিন রাত।    

 আজ এত বছর পরেও সেই দিনগুলোর স্মৃতি আমার কাছে আগুনের মতো তাজা।  অন্ধকার, গুলির শব্দ, আব্বাজি আম্মাজির চোখের ভয়, গ্রামের মানুষের সংহতি, ব্যাংক ডাকাতির খবর, শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়ে  আব্বাজির হিসেব-সব আজও স্পষ্ট।  ২৫ মার্চের রাত আমার কাছে কেবল ইতিহাস নয়-এটা আমার শৈশবের ট্রমা, আমার পরিচয়ের সূচনা, আমার পরিবারের সংগ্রামের দলিল।   যুদ্ধের ইতিহাস লেখা হয় বড় বড় নথিতে, কিন্তু শিশু-চোখে দেখা যুদ্ধের ইতিহাস লেখা থাকে স্মৃতির ভেতরে।  আমি দেখেছি-  অন্ধকারে মানুষ কীভাবে ভয়ে কাঁপছে,  কীভাবে বাঁচার জন্য ছুটে যাচ্ছে,  কীভাবে একটি বাবা প্রতিষ্ঠানের মেশিন লুকিয়ে রেখে শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ বাঁচানোর চেষ্টা করছে,  আর কীভাবে একটি ছোট্ট শিশু নিজের জন্মদিনে রাইফেল চাইছে, না জেনে সে রাইফেলই মৃত্যুর প্রতীক।   এ লেখার প্রতিটি লাইন সেই স্মৃতির সাক্ষী।  ২৫ মার্চের কালরাত শুধু ইতিহাস নয়-এটা আমার জীবনের প্রথম বড় শিক্ষা, প্রথম বড় বেদনা, আর প্রথম বড় উপলব্ধি যে স্বাধীনতা কখনো বিনা মূল্যে আসে না।তাই আজও যখন বিতর্ক হয় মিথ্যা বানোয়াট কথার চালাচালি, সত্যি বলছি মেনে নিতে কষ্ট। স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছরেও সঠিক মুক্তিযোদ্ধার হিসাব নেই। দেশে আজও স্বার্থের হানাহানি নিজেদের মধ্যে বন্ধ হোক সকল অপসংস্কৃতি আর হিংসা বিদ্বেষ। আগামী প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানুক সেটা আমাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য।