আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৮:২১ পিএম
নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে চা-স্টলে, গ্রোসারি দোকানে কিংবা কমিউনিটি আড্ডায় এখন একটি বিষয়ই ঘুরে ফিরে আসছে—মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনা এবং এর সঙ্গে যুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এক ধরনের অস্বস্তি ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। এই উদ্বেগ অমূলক নয়। কারণ, আমরা যারা প্রবাসে থাকি—আমাদের শিকড় এখনো বাংলাদেশে, আর আমাদের আত্মীয়-স্বজনের বড় একটি অংশ কাজ করেন মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। ফলে এই সংঘাত আমাদের জন্য কোনো দূরের যুদ্ধ নয়; এটি সরাসরি আমাদের পরিবার, অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ একটি আমদানি-নির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি। মধ্যপ্রাচ্যে সামান্য অস্থিরতা মানেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি—আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ে ঢাকার রাস্তায়, গ্রামাঞ্চলের সেচ ব্যবস্থায়, এমনকি সাধারণ মানুষের রান্নাঘরেও। বিদ্যুতের খরচ বাড়ে, পরিবহন ভাড়া বাড়ে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যায়। প্রশ্ন হচ্ছে—এই চাপ সামলাবে কে? সরকার কি আবার ভর্তুকি বাড়াবে, নাকি জনগণের ওপর চাপিয়ে দেবে বাড়তি খরচ? বাস্তবতা হলো—যেভাবেই হোক, শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষই এর মূল্য দেয়। আরেকটি বড় উদ্বেগ—প্রবাসী শ্রমিকরা। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে প্রায় কয়েক মিলিয়ন বাংলাদেশি কাজ করেন। যুদ্ধ বা বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিলে তাদের নিরাপত্তা, চাকরি এবং রেমিট্যান্স—সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে। অথচ এই রেমিট্যান্সই বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
এদিকে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়াই নানা তথ্য ছড়িয়ে পড়ছে। পুরনো ভিডিও নতুন করে ভাইরাল হচ্ছে, গুজব ছড়াচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের মধ্যে অযথা আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে—তথ্যের চেয়ে আবেগ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। আমাদের প্রবাসী সমাজকেও এখানে দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু আবেগ দিয়ে নয়—তথ্যভিত্তিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশ সরকারের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি কয়েকটি বিষয় স্পষ্টভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, জ্বালানি খাতে বিকল্প উৎস খোঁজা এবং নির্ভরতা কমানো এখন আর বিলাসিতা নয়—এটি সময়ের দাবি। দ্বিতীয়ত, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
তৃতীয়ত, প্রবাসী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়াতে হবে। চতুর্থত, গুজব ও ভুয়া তথ্য মোকাবিলায় সরকার, গণমাধ্যম এবং কমিউনিটিকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। আমরা যারা নিউইয়র্কে থাকি, তারা হয়তো যুদ্ধের শব্দ সরাসরি শুনি না। কিন্তু তার প্রভাব আমরা অনুভব করি—পরিবারের উদ্বেগে, অর্থনৈতিক চাপে, এবং ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট আমাদের আরেকটি বিষয় মনে করিয়ে দেয়—বিশ্ব এখন আর আলাদা আলাদা নয়। এক প্রান্তের অস্থিরতা খুব দ্রুত অন্য প্রান্তের জীবনে প্রভাব ফেলে। এই বাস্তবতায় আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন—সচেতনতা, প্রস্তুতি এবং সংযম। কারণ, দূরের আগুন একদিন না একদিন আমাদের দরজাতেও পৌঁছায়।