এম আব্দুর রাজ্জাক প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৪৫ পিএম

এম আব্দুর রাজ্জাক, বগুড়া থেকে :
যেখানে যাত্রীসেবার দায়িত্ব রেলওয়ের, সেখানে বছর পর হলেও বৈদ্যুতিক ফ্যান অচল থাকায় দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে আক্কেলপুর স্টেশনের শত শত যাত্রীকে। জয়পুরহাটের আক্কেলপুর রেলস্টেশনে প্ল্যাটফর্ম প্রায় সব বৈদ্যুতিক ফ্যান ৫ আগস্টের পর থেকেই অচল থাকলেও সংশ্লিষ্ট রেল কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন। শেষ পর্যন্ত রেলওয়ের নীরবতার মধ্যে একজন সাধারণ যাত্রীর মানবিক উদ্যোগেই বদলে যায় স্টেশনের চিত্র। সরেজমিনে দেখা যায়, দুপুরের তীব্র গরমে প্ল্যাটফর্মে বসে থাকা যাত্রীরা কাগজ ও হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছেন। অপেক্ষমাণ কক্ষেও একই চিত্র। ফ্যান অচল থাকায় অনেকেই ঘামে ভিজে দীর্ঘ সময় ধরে ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে বাধ্য হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, একাধিকবার বিষয়টি জানানো হলেও রেলওয়ের পক্ষ থেকে শুধু আশ্বাস মিলেছে, কার্যকর সমাধান আসেনি।
তবে এই পরিস্থিতিতে নাটোরগামী যাত্রী সুদীপ্ত শ্রাবণ প্রিয়া স্টেশনে এসে যাত্রীদের দুর্ভোগ দেখে নিজ উদ্যোগে প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয়ে ১০টি বৈদ্যুতিক ফ্যান দেন। এর মধ্যে প্ল্যাটফর্মে ৮টি ও অপেক্ষমাণ কক্ষে ৪টি ফ্যান স্থাপন করা হয়। কোনো প্রচার-প্রচারণা ছাড়াই শুধুমাত্র যাত্রীদের স্বস্তির কথা ভেবেই তিনি এ উদ্যোগ নেন। প্রতিদিন পাশের উপজেলা বদলগাছী ও ক্ষেতলালের শত শত যাত্রী ব্যবহার করেন আক্কেলপুর রেলস্টেশন। আন্তঃনগর ও লোকাল ট্রেনের যাত্রীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি স্টেশন। অথচ মৌলিক যাত্রীসেবার এমন দুরবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও সংশ্লিষ্টদের তদারকি ছিল না বলেই অভিযোগ উঠেছে। অপেক্ষমাণ যাত্রী কল্পনা বেগম বলেন, “বাচ্চা নিয়ে এই প্রচণ্ড গরমে স্টেশনে দীর্ঘ সময় বসে থাকা সত্যিই খুব কষ্টকর ছিল। অনেক সময় মাথা ঘুরে যেত। তবে এখন যে ফ্যানগুলো স্থাপন করা হয়েছে, তা দেখে অনেকটা স্বস্তি পাচ্ছি। অন্তত কিছুটা হলেও যাত্রীদের ভোগান্তি কমেছে।”
যাত্রী মো: মালেক সরদার বলেন, আমি ঢাকায় যাব, এসে দেখি ফ্যান গুলো লাগানো হচ্ছে। ফ্যানের বাতাস খেয়ে ভালো লাগছে। স্থানীয় বাসিন্দা তালেব বলেন, বয়স্ক মানুষদের জন্য এই গরমে স্টেশনে অপেক্ষা করা সত্যিই খুব কষ্টকর ছিল। শরীর দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল। এখন ফ্যান বসানো হয়েছে, এতে অনেকটা স্বস্তি অনুভব করছি। সুদীপ্ত শ্রাবণ প্রিয়া বলেন, “দেশটা আমার, মানুষও আমার। আমি আমার দেশ ও মানুষের জন্য কিছু করতে পারছি। একসময় হয়তো আমি থাকব না তখন যেন মনে না হয়, আমি দেশের ও মানুষের জন্য কিছুই করতে পারিনি। এই চিন্তা থেকেই আমি এই উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিবছরই মন্দিরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন স্থানে সহায়তা দেওয়া হয়। স্টেশনের ফ্যানগুলো দীর্ঘদিন ধরে অকেজো থাকায় মনে হয়েছে, এখানে ফ্যান দেওয়া উচিত। স্টেশনে মানুষ অনেক কষ্ট পায়, বিশেষ করে গরমের সময় যারা হিজাব পরেন, তারা আরও বেশি কষ্ট ভোগ করেন। ফ্যানগুলো দেওয়ার পর ভালো লাগছে, কারণ মানুষ এখন কিছুটা স্বস্তি পাচ্ছে। এ বিষয়ে আক্কেলপুর স্টেশন মাস্টার হাসিবুল হাসান বলেন, একদিন সন্ধ্যায় সুদীপ্ত দাদা এসে আমাকে জানান যে তিনি ফ্যানগুলো দিতে চান। বিশেষ করে গরমের সময় যাত্রীদের অনেক কষ্ট হয় এ বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তিনি নিজ উদ্যোগে ফ্যানগুলো স্থাপনের অভিপ্রায় ব্যক্ত করেন। তার এই প্রচেষ্টার ফলে গোপীনাথ জিউ মন্দিরের উদ্যোগে আক্কেলপুর স্টেশনে ১০টি নতুন ফ্যান স্থাপন করা হয়েছে। এতে স্টেশনের যাত্রীরা গরমের কষ্ট থেকে অনেকটাই রক্ষা পাবেন।
আক্কেপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মোঃ ইমরান হোসেন ও গোপীনাথপুর মন্দিরের উদ্যোগে একটি মহৎ কাজ গ্রহণ করা হয়েছে। আক্কেলপুর স্টেশনে যাত্রীরা বিভিন্ন সময়ে তীব্র গরমে অনেক কষ্ট পান , জনদুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ইউএনও মহোদয়ের উপস্থিতিতে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে ১০টি ফ্যান তুলে দেন সুদীপ্ত শ্রাবণ প্রিয়া। তার এই উদ্যোগকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সাধুবাদ জানাই। এখনও প্রায় আরও ১০টি ফ্যান অচল রয়েছে। আগামীতে বিত্তবান ও সচেতন মানুষদের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, যেন তারা এগিয়ে এসে এই সমস্যার সমাধানে সহায়তা করেন। আক্কেলপুরের (ভারপ্রাপ্ত) উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবিদা খানম বৈশাখী বলেন, যাত্রীদের ভোগান্তি আমাদের হৃদয়েও প্রভাব ফেলেছে। একজন মানুষ নিজের খরচে অন্যের স্বস্তির জন্য এগিয়ে আসতে পারেন, এটি সত্যিই প্রশংসনীয়। আমাদের ঐতিহ্যবাহী গোপীনাথ জিউ মন্দিরের সেবায়েত রনেন্দ্র কৃষ্ণ প্রিয়ার ছেলে সুদীপ্ত শ্রাবণ প্রিয়া রেলযাত্রীদের দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে ১০টি ফ্যান প্রদান করেছেন। স্টেশনের ফ্যানগুলো অনেক দিন ধরে অকেজো হয়ে আছে। তার এই উদ্যোগের ফলে যাত্রীদের অনেক কষ্ট লাঘব হবে। তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এমন মহৎ উদ্যোগ যদি সবাই গ্রহণ করেন, তাহলে আমাদের উপজেলার চিত্র পরিবর্তন হবে।