আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ২৩ এপ্রিল, ২০২৬, ০৯:৩৬ পিএম

বিশেষ সংবাদদাতা
গত ফেব্রুয়ারির শুরুর দিকে একটি ফেসবুক পেজে অ্যাডভোকেট এম এম নুরুজ্জামান ও তার প্রতিষ্ঠান ‘জাফ ল’ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন’-এর বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রচার করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে ছিল—নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের লাইসেন্সধারী ইমিগ্রেশন অ্যাটর্নি দাবি করা, ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং সম্প্রতি দেশ ছেড়ে পলিয়ে যাওয়া। এসব অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হলে আমরা সরেজমিন অনুসন্ধান শুরু করি। প্রাথমিক অনুসন্ধানেই অভিযোগগুলোর যথার্থতা নিয়ে সন্দেহ জাগে এবং পরবর্তী তথ্যে তা ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়। অভিযোগের অন্যতম প্রধান দিক ছিল—এম এম নুরুজ্জামান নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি পরিচয় দিয়ে ক্লায়েন্ট প্রতারিত করেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নুরুজ্জামান বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনসংক্রান্ত পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন। জাফ ল’ অ্যান্ড ইমিগ্রেশনের সাইনবোর্ড, বিজনেস কার্ড, লিফলেট, ওয়েবসাইট—কোথাও তার নামের আগে ‘অ্যাটর্নি’ লেখা নেই। তার সঙ্গে কাজ করা ১০-১২ জন ক্লায়েন্ট ও বাফেলার কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গেও কথা বলেছি। কেউই বলেননি যে নুরুজ্জামান নিজেকে অ্যাটর্নি দাবি করেছেন। বরং তিনি পরিচয় দেন ‘ইমিগ্রেশন অ্যাডভোকেট’ ও ‘কনসালট্যান্ট’ হিসেবে। অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ নুরুজ্জামান বাংলাদেশে যান এবং সেখানে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হন। এই রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কিছু প্রতিদ্বন্দ্বী মহলের কাছে অসহনীয় হয়ে ওঠে। এর আগে ওই মহলের কয়েকজন ব্যক্তি নুরুজ্জামানের কাছে আর্থিক সুবিধা চেয়েছিলেন।
তিনি রাজি না হওয়ায় পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু করা হয়। এছাড়া তার অনুপস্থিতিতে বাফেলার অফিসের সামনে অপরিচিত ব্যক্তিদের জড়ো করে ‘মানববন্ধনের’ আয়োজন করা হয়েছিল—যাদের কেউই প্রতিষ্ঠানের ক্লায়েন্ট নন। নুসরাত জাহান নামের এক নারী ফেসবুকে অভিযোগ করেন—জাফ ল’ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন তার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে। অনুসন্ধানে উল্টো চিত্র দেখা যায়। তার স্বামী আবু ইউসুফ ২০২৪ সালে দুবাইয়ে দুর্ঘটনায় নিহত হন। এরপর তিনি তার বোন ও ভাইপোকে যুক্তরাষ্ট্রে আনার জন্য জাফ ল’-এর শরণাপন্ন হন। পুরো প্রক্রিয়ায় মানবিক কারণে তার কাছ থেকে এক পয়সাও নেওয়া হয়নি। জাফ ল’ কর্মীরা তার বাসায় গিয়ে নোটারি ও অ্যাফিডেভিট সংগ্রহ করেন। নুরুজ্জামান আমাদের স্পষ্ট জানিয়েছেন, “যদি কেউ প্রমাণ দেখাতে পারে যে আমি নুসরাতের ফাইল থেকে এক পয়সা নিয়েছি, তাহলে আমি চিরতরে আইনপেশা ছেড়ে দেব।”
আতাউল বাতেন অভিযোগ করেন—তার কাছ থেকে ৫৯ হাজার ডলার হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। জাফ ল’ অফিসে গিয়ে তার ফাইল ঘেঁটে হিসাব বের করা হয়েছে। তিনি ভিজিট ভিসায় এসে ই-টু ইনভেস্টমেন্ট ভিসার জন্য আবেদন করেন। তার দোকান কেনা (৩৩,০০০ ডলার), ভাড়া (৯ মাসে ৬,৩০০ ডলার), লিকুইডেশন ফি (১,৯০০ ডলার), ভিসা এক্সটেনশন ও আপিল ফি—সব মিলিয়েই ৫৯ হাজার ডলারের কাছাকাছি হয়। তিনি ব্যবসা বিক্রি করে কিছু টাকা ফিরতও পেয়েছেন। নুরুজ্জামানের বক্তব্য, “কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে তিনি নিজেই অপপ্রচার চালিয়েছেন।” আফ্রিকান নাগরিক খাদিম সুপারভাইজ ও হেয়ারিংয়ের জন্য ২০০/১০০ ডলার করে জমা দিয়েছিলেন। কিন্তু ২ বছর পর পুরো টাকা ফেরত চান। জাফ ল’-এর সহযোগী অ্যাটর্নিদের ফি ছিল আড়াই হাজার ডলার। প্রতিষ্ঠানটি তাকে কিস্তির সুবিধা দিয়েছিল।
যে টাকা তিনি দিয়েছেন, তা নিয়মিত সেবার বিনিময়ে খরচ হয়েছে। কোনো প্রতারণা নেই। গত ৩১ মার্চ বাফেলায় জাফ ল’ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে জাবের নামের একজন উপস্থিত হয়ে লাইভ টেলিভিশনের সামনে স্বীকার করেন—‘একটি ফর্ম পূরণের জন্য ৫,৬০০ ডলার নেওয়া’ শিরোনামের খবরটি সম্পূর্ণ মিথ্যা। তিনি জানান, নুরুজ্জামান বা তার প্রতিষ্ঠান কখনো তার সঙ্গে প্রতারণা করেনি। বক্তব্য ভুলভাবে উপস্থাপনের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন। এছাড়া কমিউনিটি নেতা হাশেম তালুকদার ও অন্যরা জানান, গত চার বছরে নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নিয়ে কেউ তাদের কাছে আসেননি। তারা আরও বলেন, “নুরুজ্জামান আমাদের কাছে কখনো অ্যাটর্নি সেজে পরিচয় দেননি। তিনি সবসময় বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের আইনজীবী ও ইমিগ্রেশন কনসালট্যান্ট।”
কিছু ফেসবুক পেজে দাবি করা হয়েছিল, নুরুজ্জামান টাকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পালিয়ে গেছেন। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই আছেন। বাফেলায় তার অফিস নিয়মিত খোলা থাকে এবং কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় সাংবাদিক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাঁর সঙ্গে অফিসে বসেই কথা বলেছেন। এখন পর্যন্ত কোনো ভুক্তভোগী সরাসরি অফিসে গিয়ে অভিযোগ করেননি। বাফেলার কমিউনিটি নেতা মোহাম্মদ রুবেল জানান, অনেক ক্লায়েন্ট প্রত্যাশিত ফল না পেলে হতাশ হয়ে অপপ্রচার শুরু করেন। কুইন্স কমিউনিটি সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাবিব বলেন, “আমেরিকা আইনের দেশ। কারো অভিযোগ থাকলে তিনি সরাসরি আদালত বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দ্বারস্থ হতে পারেন। সামাজিক মাধ্যমে অপপ্রচার করে লাভ নেই।” বিশেষ অনুসন্ধানে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, এম এম নুরুজ্জামান ও জাফ ল’ অ্যান্ড ইমিগ্রেশনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অধিকাংশ অভিযোগই ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো প্রতারিত ক্লায়েন্ট আইনি পথে অভিযোগ করেননি। বরং একটি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগকারী নিজেই মিথ্যা স্বীকার করেছেন। রাজনৈতিক বিরোধ ও আর্থিক লেনদেনের জটিলতাকে কেন্দ্র করেই এই অপপ্রচারের সূত্রপাত বলে প্রতীয়মান হয়।