NYC Sightseeing Pass
ঢাকা, বৃহস্পতিবার, জুলাই ৩০, ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩
ব্রেকিং নিউজ
Dr. Mostofa Sarwar Clinches BILS Literary Award 2026 at International Rockland Retreat in New York প্রথমবার ঢাকা সফরে আসছেন ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর 'আমার ভেতরে বিচিত্রা এখনও প্রতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয় ' ‘আজ শুধু প্রেমের কথা হবে: তপুর গান’ – নিউইয়র্কে এক মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যা সাবেক সেনাপ্রধানদের ছবির মাঝে বাবার ছবি দেখে থমকে দাঁড়ালেন প্রধানমন্ত্রী দূরত্বের ভার বহন করতো যে চিঠি আকবর হায়দার কিরণের দ্য স্মেল অব লেটার্স কবিতার ইতিবাচক পাঠ সানিসাইডের কবিতার মঞ্চে কবিতায়, কথায় ও শিকড়ের স্মৃতিতে মনিজা রহমান বাংলাদেশে ৫৫ বছরে ২২ প্রেসিডেন্ট পদত্যাগ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ছুপ্পু '৩৫ দেশে ভিসামুক্ত ভ্রমণ': বাংলাদেশি পাসপোর্টের প্রকৃত চিত্র ও বাস্তবতা : কাজী আসমা আজমেরী
Logo
logo

'আমার ভেতরে বিচিত্রা এখনও প্রতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয় '


এএ্ইচএম বজলুর রহমান প্রকাশিত:  ৩০ জুলাই, ২০২৬, ০২:৩১ এএম

'আমার ভেতরে বিচিত্রা এখনও প্রতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয় '

আমি ‘বিচিত্রা’ পড়তাম শেষ পৃষ্ঠা থেকে ফুলবাগিচা গ্রামের এক কিশোরের পাঠাভ্যাস থেকে বাংলাদেশের হারিয়ে যাওয়া সাময়িকী-সংস্কৃতির গল্প  এ এইচ এম বজলুর রহমান ফুলবাগিচা গ্রাম, লালমোহন, ভোলা–৮৩৩০  আমি সাপ্তাহিক বিচিত্রা পড়তাম শেষ পৃষ্ঠা থেকে।  কেন এভাবে পড়তাম, আজ আর স্পষ্ট করে বলতে পারব না। হয়তো শেষের পাতাগুলোতে পাঠকের চিঠি, ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন, ছোট ছোট ঘোষণা আর মানুষের বিচিত্র জীবনকথা থাকত বলেই। অথবা একটি পত্রিকার ভেতরে ঢোকার জন্য আমি নিজের মতো একটি দরজা খুঁজে নিয়েছিলাম। অন্যরা যেখানে প্রচ্ছদ থেকে শুরু করত, আমি সেখানে উল্টো দিক থেকে হাঁটতাম।  লালমোহন হাই স্কুলের ছাত্র থাকাকালে একদিন প্রথম হাতে আসে বিচিত্রা। তখন আমাদের ফুলবাগিচা গ্রাম থেকে জাতীয় জীবনের কেন্দ্র ঢাকা ছিল শুধু মানচিত্রের একটি দূরের শহর। কিন্তু প্রতি সপ্তাহে বিচিত্রা সেই দূরত্ব কিছুটা কমিয়ে দিত। ভোলার লালমোহনে বসেই আমি দেশ, রাজনীতি, সাহিত্য, বিজ্ঞান, চলচ্চিত্র, ফ্যাশন, মুক্তিযুদ্ধ এবং পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচিত হতে শুরু করি।  একটি সাময়িকী যে একই সঙ্গে পাঠ্যবই, বিতর্কের মঞ্চ, সাংস্কৃতিক জানালা এবং নাগরিক শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হতে পারে, বিচিত্রা আমাকে সেই শিক্ষা দিয়েছিল।  পত্রিকাটির প্রতি আকর্ষণ এতটাই গভীর হয়েছিল যে আমরা লালমোহনে গড়ে তুলেছিলাম বিচিত্রা পাঠক ফোরাম। এখনকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি পাঠক ফোরামকে হয়তো খুব সাধারণ ব্যাপার মনে হতে পারে। কিন্তু তখন এটি ছিল নতুন চিন্তার মানুষের মিলনস্থল। আমরা লেখা নিয়ে কথা বলতাম, প্রচ্ছদ নিয়ে তর্ক করতাম, দেশের ঘটনা নিয়ে প্রশ্ন তুলতাম। মতের অমিল হতো, কখনো উত্তপ্ত বিতর্কও হতো। কিন্তু সেই বিতর্ক আমাদের আলাদা করেনি; বরং চিন্তা করতে শিখিয়েছে।  আমি কল্লোল, লালমোহন, ভোলা নামে ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপনও দিতে শুরু করি। একটি ছোট বিজ্ঞাপন ছাপা হওয়ার অপেক্ষা ছিল অসীম উত্তেজনার। নিজের নাম বা ছদ্মনাম জাতীয় একটি সাময়িকীর পাতায় দেখতে পাওয়া মানে ছিল দূরের এক বিশাল জগতের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে যাওয়া। আজকের তাৎক্ষণিক পোস্ট, মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়ার যুগে সেই অপেক্ষার আনন্দ বোঝানো কঠিন।প্রতি সপ্তাহে বিচিত্রা আমার জীবনে কিছু না কিছু যোগ করত। কখনো নতুন তথ্য, কখনো নতুন বইয়ের সন্ধান, কখনো অস্বস্তিকর প্রশ্ন, আবার কখনো এমন একটি বিতর্ক, যার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যেত না। পত্রিকাটি আমাকে শুধু কী ভাবতে হবে তা বলেনি; বরং কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, সেটিও শিখিয়েছিল।  একজন সম্পাদক, যিনি পাঠক নয়, নাগরিক তৈরি করেছিলেন  বিচিত্রাকে বোঝার জন্য শাহাদত চৌধুরীকে বোঝা জরুরি। তিনি কেবল একটি জনপ্রিয় সাময়িকীর সম্পাদক ছিলেন না। তিনি ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, শিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের মনন গঠনের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর।  ১৯৪৩ সালের ২৮ জুলাই জন্ম নেওয়া শাহাদত চৌধুরী প্রথম জীবনে চারুকলার ছাত্র ছিলেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের স্নেহধন্য এই তরুণ দেশের প্রয়োজনে তুলি রেখে অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে তিনি আবার আরেক ধরনের যুদ্ধে নামেন। সেই যুদ্ধ ছিল অজ্ঞতা, রুচিহীনতা, সংকীর্ণতা এবং সামাজিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে।  তাঁর সেই যুদ্ধের প্রধান মাধ্যম হয়ে ওঠে সাপ্তাহিক বিচিত্রা।  ১৯৭২ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত পত্রিকাটি বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের চিন্তা, ভাষা, পোশাক, সাহিত্যবোধ ও রাজনৈতিক উপলব্ধির ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এর পাতায় একই সঙ্গে স্থান পেত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, সামাজিক বৈষম্য, নারীর অধিকার, সাহিত্য, চলচ্চিত্র, কৃষি, ফ্যাশন এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতি। এটি ছিল এমন একটি পত্রিকা, যেখানে দেশকে কেবল শাসক ও বিরোধী দলের বক্তব্য দিয়ে ব্যাখ্যা করা হতো না। দেশকে দেখা হতো মানুষের জীবন, স্বপ্ন, ভয়, সৃজনশীলতা ও বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে।  শাহাদত চৌধুরীর সম্পাদনার বড় শক্তি ছিল প্রতিভা শনাক্ত করার ক্ষমতা। তিনি শুধু প্রতিষ্ঠিত লেখকদের লেখা ছাপতেন না; নতুন লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, আলোকচিত্রী এবং সংগঠকদের সামনে নিয়ে আসতেন। তিনি বুঝতেন, একটি দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু নেতা নয়, ধারণা নির্মাতা এবং সৎ সংগঠকও প্রয়োজন।  ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, স্যার ফজলে হাসান আবেদ এবং শাইখ সিরাজের মতো ব্যক্তিদের কাজ বৃহত্তর জাতীয় আলোচনায় আসার আগেই বিচিত্রা তাঁদের উদ্যোগ ও সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছিল। এর অর্থ এই নয় যে পত্রিকাটি তাঁদের সাফল্য সৃষ্টি করেছিল। বরং এটি সময়ের আগে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ ও উদ্যোগ চিনতে পেরেছিল। ভালো সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব এখানেই।  সংস্কারমুক্ত পাঠকের সন্ধানে  বিচিত্রার অন্যতম সাহসী উচ্চারণ ছিল, “সংস্কারমুক্ত না হলে বিচিত্রা পড়বেন না।”আজকের বাজারনির্ভর সংবাদমাধ্যমে এমন একটি বাক্য কল্পনা করাও কঠিন। এখন অধিকাংশ মাধ্যম পাঠককে অস্বস্তিতে ফেলতে চায় না। তারা পাঠকের বিদ্যমান বিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে তাকে ধরে রাখতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও আমাদের সেই কথাই বেশি দেখায়, যা আমরা আগে থেকেই বিশ্বাস করি।  কিন্তু বিচিত্রা পাঠককে সন্তুষ্ট করার বদলে প্রায়ই চ্যালেঞ্জ করত।  পত্রিকাটি বিয়ে, গর্ভপাত, নারীস্বাধীনতা, গণপিটুনি, চোরাচালান, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সামাজিক ভণ্ডামির মতো কঠিন বিষয়কে প্রচ্ছদে এনেছিল। সব অবস্থান নির্ভুল ছিল, এমন দাবি করা যাবে না। কোনো সম্পাদক বা প্রতিষ্ঠানই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এটি প্রশ্নকে ভয় পেত না।  শাহাদত চৌধুরীর কাছে সাংবাদিকতা কেবল ঘটনা জানানোর কাজ ছিল না। সাংবাদিকতার দায়িত্ব ছিল সমাজের জমাট বাঁধা নিশ্চয়তাগুলোকে নাড়িয়ে দেওয়া।  তাঁর সম্পাদনায় বিচিত্রা দেশীয় ফ্যাশন ও বুটিকশিল্পের বিকাশেও ভূমিকা রাখে। ঈদ ফ্যাশন প্রতিযোগিতা, পোশাকের অ্যালবাম এবং নতুন মডেলদের সামনে আনার মধ্য দিয়ে পত্রিকাটি মধ্যবিত্তের পোশাক ও নান্দনিক রুচিতে পরিবর্তন আনে। নারীদের ছবি প্রকাশ এবং তাঁদের জনপরিসরে দৃশ্যমান করে তোলাও তখন সহজ কাজ ছিল না।

 সাহিত্যেও বিচিত্রা নতুন দিগন্ত তৈরি করেছিল। ঈদসংখ্যাকে এটি বাংলাদেশের লেখকদের বড় সাহিত্যিক মিলনমেলায় পরিণত করে। সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ূন আহমদ ও মুহম্মদ জাফর ইকবালের মতো লেখকদের গুরুত্বপূর্ণ লেখা এর পাতায় প্রকাশিত হয়েছে।  কিন্তু পত্রিকাটির সবচেয়ে বড় সাফল্য কোনো একক প্রচ্ছদ, প্রতিবেদন বা সাহিত্যকর্ম নয়। এর সবচেয়ে বড় অর্জন ছিল একটি অনুসন্ধিৎসু পাঠকসমাজ তৈরি করা।  আমি ছিলাম সেই পাঠকসমাজের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একজন কিশোর সদস্য।  বিশ্বস্ততার যে পাঠ অ্যালগরিদম শেখাতে পারে না  শাহাদত চৌধুরীর সাংবাদিকতার নৈতিকতা বোঝাতে একটি ঘটনা বিশেষভাবে মনে রাখার মতো। বিচিত্রা বন্ধ হওয়ার আগে তাঁর কাছে সংরক্ষিত কয়েকজন শিল্পীর ব্যক্তিগত ছবি তিনি সহকর্মীকে দিয়ে কেটে নষ্ট করিয়েছিলেন। যাঁরা বিশ্বাস করে ছবিগুলো তুলতে দিয়েছিলেন, পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর সেগুলো অন্য কারও হাতে পড়ুক, তিনি চাননি।  এটি ছিল নীরব কিন্তু গভীর এক সম্পাদকীয় শিক্ষা: প্রকাশ করার ক্ষমতা থাকলেই সবকিছু প্রকাশযোগ্য হয়ে যায় না।

 বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই নীতিটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। এখন একটি ব্যক্তিগত ছবি, অসম্পূর্ণ তথ্য বা যাচাইহীন অভিযোগ কয়েক মিনিটে লাখো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও মানবিক মর্যাদাকে প্রায়ই ক্লিক, শেয়ার এবং দর্শকসংখ্যার কাছে বিসর্জন দেওয়া হয়।  শাহাদত চৌধুরীর শিক্ষা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সাংবাদিকতার শক্তির সঙ্গে সংযমের দায়িত্বও যুক্ত। সত্য প্রকাশের অধিকার আছে, কিন্তু কারও বিশ্বাস ভঙ্গ করার অধিকার নেই।  ‘বিচিত্রা’ নেই, শূন্যতাটি আছে  ১৯৯৭ সালে বিচিত্রা বন্ধ হয়ে যায়। পরে শাহাদত চৌধুরী সাপ্তাহিক ২০০০ ও আনন্দধারা প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক সময়ের যে সাময়িকী-সংস্কৃতি বিচিত্রা তৈরি করেছিল, সেটি আর পুরোপুরি ফিরে আসেনি।

বাংলাদেশে এখন অসংখ্য সংবাদপত্র, টেলিভিশন চ্যানেল, অনলাইন পোর্টাল, ইউটিউব চ্যানেল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পৃষ্ঠা রয়েছে। তথ্যের অভাব নেই। বরং আমরা তথ্যের অতিরিক্ত প্রবাহে প্রায় ডুবে আছি।  তবু একটি শূন্যতা স্পষ্ট।  এখন এমন একটি জাতীয় সাপ্তাহিক সাময়িকী খুব কমই দেখা যায়, যা অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, বিজ্ঞান, জনজীবন এবং নতুন ধারণাকে একই সম্পাদকীয় ছাতার নিচে যুক্ত করবে। এমন একটি মাধ্যম, যা ঢাকা ও ক্ষমতাকেন্দ্রের বাইরে গিয়ে লালমোহন, চরফ্যাশন, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা কিংবা মৌলভীবাজারের মানুষের জীবনকেও জাতীয় আলোচনার অংশ করে তুলবে।  এই অভাব আমাকে কষ্ট দেয়।  তবে শুধু অতীতের জন্য দীর্ঘশ্বাস ফেললে চলবে না। বিচিত্রাকে হুবহু ফিরিয়ে আনার চেষ্টা বাস্তবসম্মত নয়। সেই সময়ের পাঠাভ্যাস, বিজ্ঞাপনের বাজার, ছাপাখানার অর্থনীতি এবং সামাজিক পরিবেশ বদলে গেছে। আজকের নতুন সাময়িকীকে ছাপা কাগজের পাশাপাশি ওয়েবসাইট, পডকাস্ট, ভিডিও, আঞ্চলিক ভাষা এবং পাঠক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হতে হবে।  কিন্তু প্রযুক্তি বদলালেও মৌলিক প্রয়োজনটি বদলায়নি। আমাদের এখনও এমন সম্পাদক প্রয়োজন, যিনি জনপ্রিয়তার পেছনে না ছুটে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্বাচন করবেন। এমন সাংবাদিক প্রয়োজন, যিনি বিবৃতি পুনর্মুদ্রণ না করে মাঠে গিয়ে প্রশ্ন করবেন। এমন পাঠক ফোরাম প্রয়োজন, যেখানে মানুষ একে অপরকে অপমান না করে মতের পার্থক্য নিয়ে কথা বলতে শিখবে।

 একটি নতুন সাপ্তাহিকের অপেক্ষা  বাংলাদেশে নতুন একটি বিচিত্রা প্রয়োজন কি না, প্রশ্নটি আসলে পত্রিকার নাম নিয়ে নয়। প্রশ্নটি হলো, আমরা কি এখনও এমন একটি জাতীয় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর চাই, যেখানে গভীরতা দ্রুততার চেয়ে মূল্যবান, অনুসন্ধান প্রচারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং পাঠককে ভোক্তা নয়, নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করা হবে?  আমি মনে করি, প্রয়োজন আছে।  নতুন সেই সাময়িকী হয়তো কাগজে প্রকাশিত হবে, হয়তো প্রধানত ডিজিটাল হবে। তার নাম বিচিত্রা হওয়ারও প্রয়োজন নেই। কিন্তু তার ভেতরে থাকতে হবে শাহাদত চৌধুরীর সাহস, অনুসন্ধিৎসা, নৈতিকতা এবং নতুন মানুষ খুঁজে বের করার ক্ষমতা।  তাকে তরুণদের শুধু বিনোদন দিতে হবে না; তাদের প্রশ্ন করতে শেখাতে হবে। তাকে গ্রামের পাঠককে রাজধানীর দর্শক বানালে চলবে না; বরং গ্রামের অভিজ্ঞতাকে জাতীয় জ্ঞানের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। তাকে ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেয়ে সত্যের কাছাকাছি থাকার চেষ্টা করতে হবে।  আজও কোনো সাময়িকী হাতে পেলে কখনো কখনো অজান্তেই শেষ পৃষ্ঠাটি আগে উল্টে দেখি। হয়তো সেখানে আবার কোনো কিশোরের ব্যক্তিগত বিজ্ঞাপন খুঁজে পাই, যে দূরের কোনো গ্রাম থেকে নিজের নাম লিখে জাতীয় পরিসরের দরজায় কড়া নাড়ছে।  বিচিত্রা এখন আর আমাদের হাতে নেই। শাহাদত চৌধুরীও নেই। কিন্তু তাঁরা যে পাঠাভ্যাস, কৌতূহল এবং প্রশ্ন করার সাহস তৈরি করেছিলেন, তা এখনও আমার দৈনন্দিন জীবনের অংশ।  একটি পত্রিকা বন্ধ হতে পারে। একটি প্রেস থেমে যেতে পারে। পুরোনো সংখ্যাগুলো ধুলোয় ঢেকে যেতে পারে।  কিন্তু একটি সাময়িকী যদি একজন কিশোরকে তার গ্রামের সীমানা ছাড়িয়ে দেশ ও পৃথিবী নিয়ে ভাবতে শেখায়, তবে তার প্রকাশনা কখনো পুরোপুরি শেষ হয় না।  সে বেঁচে থাকে পাঠকের ভেতরে। আমার ভেতরে বিচিত্রা এখনও প্রতি সপ্তাহেই প্রকাশিত হয়।