আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৬ আগস্ট, ২০২৬, ০২:৪৮ এএম

সরকার ঘোষিত অনির্দিষ্টকালের কারফিউ, রাজধানীজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা এবং আগের কয়েক দিনের প্রাণঘাতী সহিংসতার মধ্যেও ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজপথে নেমে আসেন হাজারো ছাত্র-জনতা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘোষিত ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী জনসমুদ্রে পরিণত হয়। দিনের শেষ দিকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন বিজয়ের উল্লাসে রূপ নেয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ৫ আগস্টের আগে কয়েক দিনজুড়ে দেশজুড়ে সহিংসতা, প্রাণহানি ও অনিশ্চয়তায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। সরকার অনির্দিষ্টকালের কারফিউ জারি করলেও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। কারফিউ ও কঠোর নিরাপত্তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণে সেই কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক গতিপথ বদলে দেয়।
এর আগের দিন ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে জানান, পূর্বঘোষিত ৬ আগস্টের পরিবর্তে ৫ আগস্টই ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি পালিত হবে। বিজ্ঞপ্তিতে দেশজুড়ে মানুষকে ঢাকায় এসে ‘চূড়ান্ত লড়াইয়ে’ অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে বেলা ১১টায় শাহবাগে শ্রমিক সমাবেশ, বিকেল ৫টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নারী সমাবেশ এবং সারা দেশে গণ-অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা করারও আহ্বান জানানো হয়। অন্যদিকে সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম ঘোষণা দেন, ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হলেও কিংবা নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করা হলেও সরকার পতনের এক দফা দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। ৫ আগস্ট ভোর থেকেই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে মোড়ে সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব ও পুলিশের কড়া অবস্থান দেখা যায়। মহাখালী, বনানী, গুলশান, কারওয়ান বাজার, শাহবাগ, যাত্রাবাড়ী, মোহাম্মদপুর ও রামপুরাসহ বিভিন্ন এলাকায় কাঁটাতারের ব্যারিকেড বসানো হয়। ঢাকায় প্রবেশের প্রধান পথগুলোতে একাধিক চেকপোস্ট স্থাপন করা হয় এবং পুলিশের মাইকিংয়ে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানানো হয়। কারফিউ পাসধারীদেরও তল্লাশি ও জিজ্ঞাসাবাদের মুখে পড়তে হয়।
সকাল ১০টা পর্যন্ত রাজধানীর সড়ক প্রায় ফাঁকাই ছিল। তবে সকাল গড়াতেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। ছোট ছোট দলে শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নামতে থাকেন। পরে তাদের সঙ্গে যোগ দেন শিক্ষক, শ্রমিক, চাকরিজীবী, অভিভাবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। বেলা ১১টার দিকে মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা বন্ধ হয়ে গেলেও আন্দোলনকারীদের অগ্রযাত্রা থেমে থাকেনি। রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষের স্রোত শাহবাগের দিকে যেতে থাকে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগের পাশের গলিতে শতাধিক মানুষ একত্র হন। তাদের হাতে ছিল হ্যান্ডমাইক, মুখে ছিল এক দফার স্লোগান। সে সময় শাহবাগ মোড়ে সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যান, সেনাসদস্য এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। হাসপাতাল এলাকায় প্রবেশ ও অবস্থানের ক্ষেত্রেও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। সাড়ে ১১টার পর শাহবাগ এলাকায় গুলির শব্দ শোনা যায়। চানখাঁরপুলের দিক থেকে বিস্ফোরণের শব্দও ভেসে আসে। এর মধ্যেই দুপুর ১২টার কিছু পর মৎস্য ভবনের দিক থেকে প্রায় ৫০০ মানুষের একটি মিছিল শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়।
মিছিলের সামনের সারিতে ছিলেন প্রায় ৫০ জন নারী। সেখানে কিশোর থেকে প্রবীণ সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল। ওভারব্রিজের কাছে সেনাবাহিনী মিছিলটি থামানোর চেষ্টা করলে সামনের সারির আন্দোলনকারীরা সেনাসদস্যদের হাতে ফুল তুলে দেন। ঘটনাটি মুহূর্তেই সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরে আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড অতিক্রম করে শাহবাগে অবস্থান নেন এবং পুরো এলাকা এক দফার স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আরও মানুষ শাহবাগে এসে যোগ দেন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শাহবাগ ও আশপাশের সড়ক জনসমুদ্রে পরিণত হয়। এ সময় সেনাপ্রধান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়ে। এর কিছুক্ষণ পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে চলে গেছেন এই খবর দ্রুত রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। খবরটি প্রকাশ্যে আসার পর শাহবাগে শুরু হয় উচ্ছ্বাস।
কেউ আনন্দে কাঁদেন, কেউ সিজদায় লুটিয়ে পড়েন, আবার কেউ একে অপরকে জড়িয়ে ধরেন। অনেককে সেনাসদস্যদের সঙ্গে করমর্দন ও আলিঙ্গন করতেও দেখা যায়। পরে ইন্টারনেট সেবা স্বাভাবিক হলে খবরটি দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। হাজারো মানুষ বিজয়ের মিছিল নিয়ে গণভবনের দিকে রওনা হন। শাহবাগ, বাংলামোটর, কাকরাইল, টিএসসি ও মৎস্য ভবন এলাকা মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। দিনভর কারফিউ, কড়া নিরাপত্তা, ইন্টারনেট বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও ৫ আগস্ট রাজধানীর রাজপথে যে গণজমায়েত সৃষ্টি হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়। কারফিউ ভেঙে মানুষের রাজপথে নেমে আসা, শাহবাগে জনস্রোতের সৃষ্টি এবং দিনের শেষে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিন হিসেবে স্থান করে নেয়।