মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি খ্রিষ্টানদের অন্যতম সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশন ইনক (বিসিএ)-এর উদ্যোগে গত ১২ এপ্রিল, রবিবার, সিলভার স্প্রিংয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হলো বার্ষিক ‘ইস্টার পুনর্মিলনী ও বৈশাখী উৎসব ২০২৬’। রসকো নিক্স এলিমেন্টারি স্কুলে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিকেল ৪টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত প্রায় চার শতাধিক প্রবাসী বাংলাদেশির মিলনমেলায় যেন এক টুকরো বাংলাদেশ ফুটে ওঠে। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রার মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এতে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মেরিল্যান্ড জেনারেল অ্যাসেম্বলির ডিস্ট্রিক্ট ৩৯-এর সম্মানিত ডেলিগেট গ্রেগ উইম্স  এবং মন্টগোমারি কাউন্টির সরকারি কর্মকর্তা আনিস আহমেদ। শোভাযাত্রা শেষে সাংগঠনিক পর্ব সঞ্চালনা করেন বিসিএ’র বর্তমান সেক্রেটারি বিভাস রোজারিও। দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন ও প্রার্থনার মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠান শুরু হয়। বিসিএ’র বর্তমান সভাপতি বিপুল এলিট গনছালভেস ইস্টার ও বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “প্রতিদিনের জীবনে যিশু খ্রিষ্টের শেখানো প্রার্থনা অনুসরণ করে নিজেদের আত্মিকভাবে গড়ে তুলতে হবে।” ডেলিগেট গ্রেগ উইম্স তাঁর বক্তব্যে মেরিল্যান্ডের বহুসাংস্কৃতিক সমাজে বাংলাদেশি কমিউনিটির গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করেন। এরপর পরিবেশন করা হয় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী বৈশাখী খাবার। অংশগ্রহণকারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিভিন্ন ধরনের ঘরোয়া খাবার নিয়ে আসেন, যা পুরো পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত ও আপন করে তোলে। পাশাপাশি ছিল ঝালমুড়ি ও চানাচুরের আয়োজন। শিশুদের আনন্দ দিতে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিল ‘ইস্টার বানি’, যা তাদের মাঝে বাড়তি উচ্ছ্বাস যোগ করে। এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রেদোয়ান চৌধুরী এবং আফ্রিকান-আমেরিকান বংশোদ্ভূত জেরেমিয়া পোপ , যাঁরা মেরিল্যান্ডের মন্টগোমারি কাউন্টি কাউন্সিল অ্যাট-লার্জ পদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিসিএ রেদোয়ান চৌধুরীর এই প্রার্থিতাকে যুক্তরাষ্ট্রের মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণের একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করে। তাঁর এই প্রার্থিতা শুধু একটি নির্বাচন নয়, বরং বাংলাদেশি কমিউনিটির প্রতিনিধিত্ব, নেতৃত্ব এবং আগামী প্রজন্মের জন্য নতুন সম্ভাবনার বার্তা। সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক সম্পাদক জীবন পেরার তত্ত্বাবধানে লিমা কোড়াইয়া, কাজুরি রোজারিও ও কেনি পিউরিফিকেশনের প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

সবিতা গমেজ ও রিমা গমেজের পরিচালনায় বিসিএ শিল্পীবৃন্দের দলীয় সংগীত পরিবেশিত হয়; তবলায় ছিলেন ড. পল ফেবিয়ান গমেজ।  অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের মধ্যে ছিলেন—ড. প্যাট্রিশিয়া শুক্লা, ডলি, পান্না, আইরিন, রুমা, মুক্তি, সান্তনা, রিক্তা, লিপি, ট্রেসি, পপি, নির্মল, ডেনিস, জীবন, কাজরী ও হীরা। অনুষ্ঠানে দর্শকনন্দিত নৃত্যশিল্পী ও শিক্ষক শিল্পী গ্লোরিয়া রোজারিওর পরিচালনায় মঞ্জুরি নৃত্যালয়ের পরিবেশনা এবং জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী রোজমেরি মিতু রিবেরোর পরিচালনায় সৃষ্টি নৃত্যাঙ্গনের বিশেষ পরিবেশনা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। এছাড়াও ল্যানি ও ট্রিজার নৃত্য পরিবেশনা দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠানে পংকজ ও দীপিকার দ্বৈত কৌতুক, শীতল পেরেরার একক কৌতুক এবং রুমা গমেজের রম্য সংবাদ পাঠ দর্শকদের বিশেষভাবে আনন্দ দেয়। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন অবন্তিকা গমেজ, অরিন তেরেজা রোজারিও এবং স্থানীয় জনপ্রিয় শিল্পী পিন্টু পালমা। ‘নারী বাই নারী’ উদ্যোগের উদ্যোক্তা সোমা রোজারিও ‘মা’ বিষয়ক কবিতা আবৃত্তি করেন। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল পূজা পালমার কোরিওগ্রাফিতে এবং জিনিয়া গনছালভেসের পরিকল্পনায় বয়োজ্যেষ্ঠদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত ঐতিহ্যবাহী পুতুল নাচ। অনুষ্ঠানে ছিল মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, বর্ণিল বৈশাখী আয়োজন, সুস্বাদু খাবার, র‍্যাফেল ড্র এবং নানা আকর্ষণীয় কার্যক্রম। র‍্যাফেল ড্র ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম রোমাঞ্চকর অংশ, যেখানে ১৫টিরও বেশি আকর্ষণীয় পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। গ্র্যান্ড পুরস্কার হিসেবে ঢাকা-বাংলাদেশ বিমান টিকিট প্রদান করা হয়, যা স্পনসর করেন বিশিষ্ট রিয়েলটর এলবার্ট গমেজ, রিয়েলটর এথান গমেজ এবং মর্টগেজ লোন অফিসার তৌফিক মতিন। র‍্যাফেল ড্র অনুষ্ঠানে অন্যান্য  অতিথিদের সাথে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ থেকে আগত ফাদার সুবাস কস্তা, সিএসসি এবং বিসিএ’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জুড ভি. গমেজ।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সাবেক সভাপতি লিও রড্রিকস, সম্পদ পেরেরা, ড. প্যাট্রিশিয়া শুক্লা ও শ্যামল ডি’কস্তা। শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সের মানুষের উপস্থিতিতে পুরো আয়োজনটি আনন্দমুখর হয়ে ওঠে। রাতের আহারে ছিল ইলিশ মাছ, সাদা ভাত, ডাল, আলুভর্তা, বেগুন ভর্তা, কচুশাক, চ্যাপা ভর্তা, মিষ্টি, দই এবং পান-সুপারিসহ বাহারি আয়োজন। আয়োজকরা জানান, এ ধরনের আয়োজন প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের মাঝে বাংলা সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি ইস্টার ও বৈশাখ একসঙ্গে উদযাপনের মাধ্যমে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও বন্ধন আরও দৃঢ় হয়। অনুষ্ঠান সফলভাবে সম্পন্ন করতে বিসিএ’র বর্তমান ভাইস-প্রেসিডেন্ট ডেনিস ডমিনিক রোজারিও পরিষদের পক্ষ থেকে অংশগ্রহণকারী, স্বেচ্ছাসেবক, স্পনসর এবং উপস্থিত অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। ফাদার সুবাস কস্তা, সিএসসি-এর সমাপনী আশীর্বাদের মাধ্যমে নতুন বছরের নতুন প্রেরণায় এগিয়ে চলার প্রত্যয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।