নন্দিনী লুইজা
"থাকবো নাকো বদ্ধ ঘরে, দেখবো এবার জগৎটাকে" যে মানুষটি এই কথাগুলো লিখতে পারে তার চিন্তা চেতনায় মনণশীলতা, দর্শনে শত শত বছর এগিয়ে আছে। আজকে আমরা যারা প্রযুক্তিতে বাস করছি ঠিক তারই কথাগুলোই প্রতিফলিত হচ্ছে। এ ধরনের ক্ষণজন্মা মানুষগুলো পৃথিবীতে মাঝে মাঝে আবির্ভূত হয় তাঁরা পৃথিবীর পরিক্রমায় কি ঘটনা ঘটবে, ঘটতে যাচ্ছে তাদের লেখনীতে এমন কথা উঠে আসে। তাঁরা ভবিষ্যৎবাণী করতে পারে অবলীলায় তাদেরই একজন- তারি নাম নজরুল তাতে কোন নেই ভুল। পূর্বে পলাশ রাঙা প্রান্তরের পাশে শাল -তাল-তমাল আর হরীতকীরর বন।
এর মাঝখানে ছোট্ট একটি গ্রাম চুরুলিয়া। গ্রামের পশ্চিমে কয়েক ঘর চাষী মুসলমানের বাস। এইখানেই বাংলা ১৩০৬ সালের ১১ জৈষ্ঠ্য জন্মগ্রহণ করেছিলেন বাংলার গৌরব, অপরূপ সুরস্রষ্টা,অভিনব গীতিকার জনগণ -চিত্তরঞ্জন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। নিরানন্দ পরিম্লান দরিদ্র্যের সংসার। কিন্তু জন্মলগ্নে বিধাতা যার ললাটে এঁকেছেন কবিত্বের জয়টিকা মন তাঁর ছুটে চলে ছন্দবন্ধ সুরলোকে আনন্দের সন্ধানে। তাই যেখানে গান, যেখানে সুর, কবি, যাত্রা, লেটো, ঝুমুর বালক নজরুল ঘুরে বেড়ায় সেইখানে। গান গায়, বাজনা বাজায়, গীত রচনা করেন। কিন্তু চিরচঞ্চল শিল্পীমন কোথাও স্থির থাকতে পারে না। অশান্ত মন ছুটে বেড়ায় এখানে সেখানে।
কখনো রুটির দোকানে খানসামা, কখনো গার্ড সাহেবের বাবুর্চি, কখনো মক্তবের শিক্ষক। সবাই বলে আহা সেটা ভালো লেখাপড়া শিখলে মানুষ হতে পারবে। তাই সে মানুষ হতে গিয়েছিল একবার ময়মনসিংহে ,একবার মাথরুণে,শেষ বাড়ির কাছে শিয়ারশোলে। লেখাপড়া শেখার জন্য তাকে মক্তবে ভর্তি করে দেওয়া হয়। সেই মক্তবে বোডিংয়ের একটি জানালার পাশে ছোট্ট একটি খাটিয়া খাটিয়ার উপর পরিষ্কার একটি বিছানা পাতা বিছানার উপর ছোট ছোট দুটো বালিশ আর বই খাতার ছড়াছড়ি দেখলেই চেনা যায় অগোছালো কোন এক ছন্নছাড়া ছেলে আস্তানা যার নাম দুখু মিয়া। নজরুল মানুষের আপাদমস্ত বিচার বিশ্লেষণ করে তার মূল্যবোধ কি হতে পারে সবকিছুই লিখে গেছেন। তিনি প্রচণ্ড রকমের ভাববাদী বলেই সব ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল অগাধ বিশ্বাস।
তিনি গোড়ামী ছিলেন না। তিনি সব ধর্মকেই শ্রদ্ধা করে প্রত্যেকটা ধর্মের যে কুসংস্কার গুলো আছে সেগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন, সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করেছেন আবার তোরা মানুষ হ। "আমি হব সকাল বেলার পাখি"- যদি এই কবিতাটি বিশ্লেষণ করতে চাই সেখানে মানুষের সন্তানেরা কিভাবে তাদের জীবন বোধ তৈরি করবে, তার সুস্থ স্বাভাবিক জীবন কিভাবে চলানো উচিত তাই কবিতার মধ্যে সে অকপটে বলে গেছেন। আমরা কবিতা পড়ার জন্য পড়ি কিন্তু তার গভীরে ঢুকি না এটা আমাদের বড় একটা দুর্ভাগ্য। কবিতা পড়ে ভালো লাগে, শুনতে ভালো লাগে আমরা অনেক কিছুই বোঝার ক্ষেত্রে নিজেকে শাণিত করি না। কবিতার ভাষা বুঝিনা। তাহলে কিভাবে আমরা আমাদের নিজস্ব মূল্যবোধ জাগ্রত করব। কবি সাহিত্যিকরা শুধু উপলব্ধি করে লেখেননি, অনুভব করেই লেখেননি তাঁরা বাস্তব দেখে বাস্তবতা নিরিখে লেখার চেষ্টা করেন বা করেছেন।
যা যুগে যুগে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। নজরুল এত সাহসী লেখক ছিলেন তিনি ১৯২১ সালে গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনের বিপুল তরঙ্গ দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ শাসনের স্তম্ভকে শিথিল করে দিয়েছিল। সেই সময় নজরুল অগ্নিবীনার ঝংকারে দেশের আবাল, বৃদ্ধ বনিতার প্রাণে দেশের প্রতি কর্তব্য চেতনা জাগিয়ে আন্দোলন সফল করার প্রেরণা জুগিয়েছিলেন। ১৯২১ সালের ডিসেম্বরে কবির আত্মজাগরণের বিপুল ও বিস্ময়কর এক প্রকাশ "বিদ্রোহী" কবিতা। বিজলী পত্রিকায় প্রকাশের পরের দিন নজরুল জোড়াসাঁকো গিয়ে গুরুজী, গুরুজী বলে চিৎকার করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ডাকতে থাকেন। আর বলতে থাকেন গুরুজী আপনাকে হত্যা করব, হত্যা করব, রবীন্দ্রনাথ এ কথা শুনে নজরুলকে তার দোতলার কামড়ায় বসতে বলেন। সব কথা শুনে তিনি কাজীর মুখের দিকে বিস্ময়ে চেয়ে রইলেন। ধীরে ধীরে উঠে কাজীকে জড়িয়ে ধরে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, "সত্যি তুমি আমাকে হত্যা করেছ"।
এমন ধরনের কবিতা আজ বুঝি কোন কবি লিখতে পেরেছেন কিনা জানা নেই। বিদ্রোহী কবিতা পড়লে আজও পর্যন্ত শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। অন্যায় দেখলে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছা করে। শত শত বছর বেঁচে থাকবে যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে আর মানুষের মনেকে উজ্জীবিত করার জন্য এমন ধরনের কবিতা জীবনে বড়ই প্রয়োজন বড়ই প্রয়োজন। সাহসা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মধ্যে স্তম্ভ হয়ে যায় ১৯৪২ সালে জুলাই মাসে কলকাতা বেতার কেন্দ্রে অনুষ্ঠান করার সময়। জীবনের মধ্যাহ্নবেলায় ভাগ্যের নিষ্ঠুর একটি মসীকৃষ্ণ যবনিকা নেমে এলো তাঁর মানসলোকে। মাত্র ৪৪ বছর বয়সে কবির মস্তিষ্ক অসাড় হলো, কন্ঠ হয়ে গেল নিরব। দেশ-বিদেশের কোন চিকিৎসায় ফল হলো না। স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু নিয়ে এলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সম্মতি আদায় করে। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত নজরুলের গান- কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে যেন আগুন ধরিয়ে দিত। এই কবিকেই বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে,বরণ করেছে, তাঁকে মর্যাদা দিয়েছে "জাতীয় কবি" হিসেবে স্বৃকীতি দিয়েছে। লেখক ও প্রকাশক
