আকবর হায়দার কিরন
২০১৫ সালের এই দিনেই জনাব আতিকুল আলম আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। তাঁর এই চিরবিদায়ের দিনে আজ তাঁকে স্মরণ করছি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং অগাধ কৃতজ্ঞতায়। প্রবীণ সাংবাদিক আতিকুল আলম ভাই ছিলেন আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতার সেই পথিকৃৎ, যাঁর হাত ধরে বাংলাদেশের সংবাদ আন্তর্জাতিক জগতে প্রবেশ করে নির্ভরযোগ্যতা আর পেশাদারিত্বের পরিচয়ে। আশির দশকে তিনি ছিলেন রয়টার, বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ভিজ নিউজ, ডয়েচে ভেলেসহ অন্তত ২৫টি আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার একক প্রতিনিধি—এমন নিঃশব্দ অথচ অনন্য উচ্চতায় পৌঁছানো সাংবাদিক তখন আর কেউ ছিলেন না।
আমার সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা শুরু খন্দকার হাসনাত করিম পিন্টু ভাইয়ের সচিত্র স্বদেশে প্রকাশিত একটি কভার স্টোরির মাধ্যমে—“ঢাকা থেকে আমাদের সংবাদদাতা জানাচ্ছেন”। সেই সূত্রে তাঁকে চেনা, আর পরে জানা গেল এক অসাধারণ মানুষকে—সহৃদয়, নিরহংকারী এবং উদার। ১৯৭৯ সালে, জাতীয় প্রেস ক্লাবের পুরাতন ভবনের পেছনের বারান্দায় আমরা আয়োজন করি দেশের ইতিহাসের প্রথম ‘ডিএক্সিং প্রদর্শনী’। সে আয়োজনের প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভাই—তাঁকে আমরা পেয়েছিলাম আতিক ভাইয়ের মাধ্যমেই।
সেদিনের অনুষ্ঠানে গিয়াস কামাল চৌধুরী ভাই উপস্থিত হয়ে আমাদের কর্মযজ্ঞ দেখে বিস্মিত হন এবং পরে তিনি আমাদের রেডিও ক্লাব আন্দোলনের একজন অভিভাবকে পরিণত হন। সেই প্রদর্শনীতে আতিক ভাই ৫০০ টাকা দিয়ে আমাদের সাহায্য করেন, যা আমাদের জন্য এক অপার প্রেরণা ছিল। পরে তিনি আমাকে নিয়ে যান ইত্তেফাক সম্পাদকীয় অফিসে। সেই সূত্রে আমাদের রেডিও ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেন বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের প্রধান মার্ক ডড সাহেবও—যা সেই সময় ছিল এক ঐতিহাসিক সংযোগ।
আতিক ভাইয়ের সাথে পেশাগত সম্পর্ক কখন যেন রূপ নেয় পারিবারিক ঘনিষ্ঠতায়। তাঁর ও ভাবির নিউ বেইলী রোডের বাসায় কতবার যে গেছি! তাঁদের সন্তান বাবু ও দীপু ছিল আমাদের প্রিয় ছোট ভাইয়ের মতো। মাত্র কিছু মাস আগেও তাঁদের সঙ্গে কথা হয়েছিল আমার আত্মীয় ডা. এস. এম. মোস্তফা জামান-এর ক্লিনিক থেকে। কে জানত, সেটিই হবে শেষ কথা! আজ যখন দেখি, গিয়াস কামাল ভাই, আতাউস সামাদ ভাই, এবিএম মুসা ভাই, জগলুল ভাই, এবং সবশেষে প্রিয় আতিকুল আলম ভাই একে একে চলে গেলেন—তখন মনে হয়, আমাদের সময়, আমাদের লড়াই, আমাদের স্বপ্নের এক বিশাল অধ্যায় শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাঁর প্রয়াণের দিনে শ্রদ্ধার সঙ্গে শুধু এই কথাটিই বলতে ইচ্ছে করে— “সংবাদ সংগ্রহ ছিল তাঁর নেশা, মানুষ ছিল তাঁর ভাষা।” বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম তাঁকে চিরদিন কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করবে।
