সম্পাদকীয়

 রক্তের ঋণ ভুলে যাওয়ার রাজনীতি নয়

 আকবর হায়দার কিরন

 বাংলাদেশ কোনো আকস্মিক রাষ্ট্র নয়। এটি জন্ম নিয়েছে গণহত্যার ভেতর দিয়ে, মায়ের সম্ভ্রমহানি, শহীদের রক্ত আর বুদ্ধিজীবীদের নিথর দেহের ওপর দাঁড়িয়ে। ১৯৭১ কেবল ইতিহাসের একটি বছর নয়—এটি আমাদের আত্মপরিচয়, আমাদের নৈতিক সীমারেখা।  সেই মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পাশে দাঁড়িয়েছিল, যারা স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল, যারা রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসের মাধ্যমে এ দেশের সন্তানদের হত্যায় সহযোগিতা করেছিল—তাদের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার আজও যদি দায় স্বীকার না করে, তবে সেই নীরবতা নিজেই এক ধরনের অবস্থান।  ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে ভবিষ্যতের দাবি তোলা যায় না।

 রক্তের ঋণ অস্বীকার করে নৈতিক নেতৃত্ব দাবি করা যায় না।  আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল বহু বছরের চাপা ইতিহাসকে আইনের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। কেউ কেউ বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু ১৯৭১-এর নৃশংসতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। এ দেশের মাটি জানে কারা শহীদ হয়েছে, কারা প্রতিরোধ করেছে, আর কারা প্রতিরোধের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।  আজ যখন আবার ধর্মের ভাষা ব্যবহার করে রাজনীতি করার চেষ্টা হয়, যখন মানুষের ঈমানকে ভোটের অঙ্কে পরিণত করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন শঙ্কা জাগে। “বেহেশতের প্রতিশ্রুতি” দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার অধিকার দাবি করা গণতন্ত্রের ভাষা নয়—এটি আবেগের শোষণ।

 বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ—কিন্তু তারা উগ্র নয়। তারা তালেবান চায় না, তারা মধ্যযুগে ফিরতে চায় না। তারা চায় উন্নয়ন, মর্যাদা, স্বাধীন মতপ্রকাশ, নারীর সমান অধিকার, সাংস্কৃতিক মুক্তি।  আমাদের রাষ্ট্রের ভিত্তি চারটি মূলনীতি—জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। যে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে স্পষ্ট ভাষায় বলতে হবে—তারা কি এই ভিত্তির প্রতি নিঃশর্ত অঙ্গীকারবদ্ধ? নাকি ইতিহাসের দায় এড়িয়ে ক্ষমতার শর্টকাট খুঁজছে?  রাজনীতি হতে পারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার।  কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে আপসের কোনো জায়গা নেই।  বাংলাদেশ আফগানিস্তান নয়, হবে না—এই ঘোষণা কেবল আবেগ নয়, এটি একটি অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার রক্ষা করতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে—স্বাধীনতার চেতনা কোনো দলের সম্পত্তি নয়, এটি জাতির আত্মা।  ইতিহাস ভুলে গেলে জাতি পথ হারায়।  আর ইতিহাসের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করলে ভবিষ্যৎ ক্ষমা করে না।