নিউইয়র্ক: জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি সালাউদ্দিন নোমান চৌধুরী ২০২৫ সালের ১৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই দিনে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব António Guterres–এর কাছে তাঁর পরিচয়পত্র পেশ করেন। দায়িত্ব গ্রহণের এক বছরেরও বেশি সময় পর নিউইয়র্কে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির একাংশের মধ্যে তাঁর কূটনৈতিক উপস্থিতি, জনসংযোগ এবং সামগ্রিক কমিউনিটি সম্পৃক্ততা নিয়ে আলোচনা ও প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। ঐতিহ্যগতভাবে, জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন কেবল কূটনৈতিক কার্যক্রমেই সীমাবদ্ধ ছিল না—বরং এটি প্রবাসী কমিউনিটি, গণমাধ্যম এবং সাংস্কৃতিক সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবেও বিবেচিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো জাতীয় দিবসগুলোতে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, শিল্পী, সাংবাদিক এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের অংশগ্রহণে এক ধরনের “মিনি জাতিসংঘ” পরিবেশ সৃষ্টি হতো।
কিন্তু কমিউনিটি পর্যবেক্ষকদের মতে, গত এক বছরে সে ধরনের উন্মুক্ত ও বিস্তৃত কার্যক্রম অনেকটাই সীমিত হয়ে এসেছে। বাংলাদেশি গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, প্রবাসী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময় এবং বৃহৎ পরিসরের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান—এসব ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতির অভিযোগ উঠছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, কনস্যুলেট জেনারেলের আয়োজিত কিছু অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে স্থায়ী প্রতিনিধি বক্তব্য দেওয়ার পর প্রায়ই নির্দিষ্ট কিছু সহযোগীসহ ভেতরের একটি অফিস কক্ষে চলে যান এবং সেখানেই সীমিত পরিসরে আয়োজিত খাওয়া-দাওয়া শেষ করে অনুষ্ঠান ত্যাগ করেন। ফলে সাধারণ অতিথি, কমিউনিটি প্রতিনিধি এবং আমন্ত্রিত ব্যক্তিদের সঙ্গে প্রত্যাশিত সৌজন্য বিনিময় ও পরিচিতি অনেক ক্ষেত্রেই অনুপস্থিত থাকে বলে অভিযোগ। সম্প্রতি আরও জানা গেছে যে, ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে জাতিসংঘ বাংলাদেশ মিশন একটি ‘বিশেষ অনুষ্ঠান’ আয়োজন করে নিউইয়র্কের ব্যয়বহুল Millennium Hotel–এ। যদিও মিশনের নিজস্ব সুবিশাল মিলনায়তন থাকা সত্ত্বেও বাইরে এই আয়োজন করা হয়।
মিশন সূত্রে জানা গেছে, এই অনুষ্ঠানের অতিথি তালিকায় প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী বিস্তৃত কমিউনিটি বা গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি—যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে প্রবাসী মহলে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত বাংলাদেশি পেশাজীবী এবং অন্যান্য কূটনৈতিক মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ ও নেটওয়ার্কিং–এর ক্ষেত্রেও পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় কম সক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে—এমন মন্তব্যও করছেন কেউ কেউ। এর বিপরীতে, অতীতে দায়িত্ব পালন করা স্থায়ী প্রতিনিধিরা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, কূটনৈতিক মহল এবং প্রবাসী কমিউনিটির সঙ্গে সক্রিয় ও উন্মুক্ত যোগাযোগ বজায় রেখে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন বলে মনে করেন অনেকে। বিশেষ করে জাতীয় দিবসগুলোতে উন্মুক্ত অংশগ্রহণ এবং গণমাধ্যমের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল একটি পরিচিত ধারা।
সম্প্রতি নিউইয়র্ক সফরে আসা পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের সফর নিয়েও প্রবাসী মহলে সীমিত জনসম্পৃক্ততার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। তবে এসব বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। সব মিলিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশি মহলের একাংশের মধ্যে এখন একটি প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে—এটি কি এক ধরনের “quiet diplomacy” নাকি একটি ঐতিহ্যবাহী কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার ধারাবাহিকতা থেকে সরে আসা? সময়ই এর উত্তর দেবে।
