অন্বেষার বৈশাখী ঝড়

নন্দিনী লুইজা

ঢাকার এক ব্যস্ত ফ্ল্যাটে বসে অনেষা ল্যাপটপের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে। বাইরে এপ্রিলের রোদ, কিন্তু তার ঘরের ভেতরটা যেন নিস্তেজ। ফেসবুকে স্ক্রল করতে করতে সে দেখে-সবাই “শুভ নববর্ষ” লিখছে, লাল-সাদা পোশাক পরে ছবি দিচ্ছে, রেস্টুরেন্টে “বৈশাখী বুফে”।

কিন্তু কোথাও যেন সেই বৈশাখ নেই।

না আছে কাঁচা মাটির গন্ধ,

না আছে ঢাকের সেই প্রাণ কাঁপানো শব্দ।

অনেষা হঠাৎ বুঝতে পারে-বৈশাখ এখন যেন একটা “ইভেন্ট”, একটা “ফটোসেশন”।

ছোটবেলায় বৈশাখ মানেই ছিল গ্রামে যাওয়া।

মায়ের হাতের পান্তা, বাবার সঙ্গে হালখাতা, মাঠে মেলা।

কিন্তু এখন?

তার ছোট ভাই অর্ণব বলে,

-“আপু, এই গরমে বাইরে যাওয়ার কী দরকার? অনলাইনে অর্ডার করলেই তো পান্তা-ইলিশ পাওয়া যায়!”

অনেষা চুপ করে যায়।

সে ভাবে-

পান্তা কি শুধু খাবার?

নাকি এটা একটা স্মৃতি, একটা অনুভব?

হঠাৎ করেই সে সিদ্ধান্ত নেয়-এইবার সে গ্রামে যাবে।

মা অবাক হয়ে বলে,

-“এখন তো কেউ যায় না মা! শহরেই সব হয়।”

অনেষা ধীরে বলে,

“সব হয়… কিন্তু সব অনুভব করা যায় না।”

গতবারের কথা খুব মনে পড়ে অন্বষার।গ্রামের নাম শালিকখোলা। ছোট্ট, শান্ত, অথচ বৈশাখ এলেই যেন অন্য রূপ নেয়। চারদিকে কাঁচা রাস্তা, পুকুরঘাট, তালগাছের সারি-সব মিলিয়ে যেন এক চিরচেনা অথচ নতুন করে সাজানো ছবি।

সেই গ্রামেই অনেষার দাদার বাড়ি। শহরে পড়াশোনা করলেও প্রতি বৈশাখেই সে ফিরে আসে গ্রামে। তার কাছে বৈশাখ মানে-মায়ের হাতের পান্তা-ইলিশ, বাবার কেনা নতুন শাড়ি, আর সকালবেলার সেই মঙ্গল শোভাযাত্রা।

এইবারও সে সবাইকে নিয়ে গ্রামে ফিরতে ছেয়েছিল। কিন্তু এইবারের বৈশাখে তার মনে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কারণ, ঐ গ্রামেই আছে আরিয়ান-শৈশবের বন্ধু, যার সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের, কিন্তু অনুভূতিটা ছিল গভীর।

ভোর হতেই কোকিলের ডাক। দূরে কারও রেডিওতে বাজছে-

“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…”

অনেষা ঘুম ভাঙতেই দেখে তার পোষা বিড়াল আঁকি জানালার ধারে বসে আছে। যেন সেও অপেক্ষা করছিল এই দিনের জন্য।

মা এসে বলল,

“উঠ মা, আজ তো ১লা বৈশাখ! এত ঘুমালে চলে?”

অনেষা হেসে উঠে পড়ে। লাল-সাদা শাড়িটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। মনে হয়, সে শুধু নিজেকে সাজাচ্ছে না-একটা সংস্কৃতিকে বুকে ধারণ করছে।

গ্রামের স্কুলের সামনে জমে উঠেছে শোভাযাত্রা। ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা মুখে রঙ মেখেছে-কেউ বাঘ, কেউ পাখি, কেউবা সূর্য।

ঢাকের তালে তালে এগিয়ে যাচ্ছে সবাই।

অনেষা হঠাৎ দেখতে পায়-আরিয়ান ঢাক বাজাচ্ছে।

তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য থেমে যায় সবকিছু।

আরিয়ান তাকায়। দু’জনের চোখে চোখ পড়ে। কোনো কথা নেই, কিন্তু অনেক কিছু বলা হয়ে যায়।

শোভাযাত্রা শেষে সবাই বসেছে খাওয়ার আয়োজনে। কলাপাতায় সাজানো পান্তা, ইলিশ ভাজা, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ।

অনেষা বসতেই পিঁউ এসে তার কোলে উঠে পড়ে। সবাই হাসে।

আরিয়ান পাশে বসে বলে,

“ডোরা”তো এখনো তোর মতোই একগুঁয়ে।”

অনেষা হেসে বলে,

“সবাই তো বদলে যায় না।”

এই কথার ভেতরেই যেন লুকিয়ে থাকে বহু বছরের না বলা কথা।

বিকেলে গ্রামের দোকানগুলোতে হালখাতা। লাল খাতায় নতুন হিসাব খোলা হচ্ছে।

অনেষা বাবার সঙ্গে যায়। দেখে, দোকানদার সবাইকে মিষ্টি দিচ্ছে।

বাবা বলেন,

-“দেখিস, নতুন বছর মানে শুধু হিসাব না, সম্পর্কও নতুন করে গড়া।”

এই কথাটা অনেষার মনে গেঁথে যায়।

সব শেষে অনেষা বুঝতে পারে-

ঐতিহ্য নিজে থেকে হারিয়ে যায় না,

আমরাই তাকে ছেড়ে দিই।

বৈশাখকে বাঁচাতে বড় কিছু লাগে না,

লাগে শুধু একটু ইচ্ছে,

একটু ভালোবাসা।

ঢাকার ফ্ল্যাটে ফিরে তার মন। অনেষা আবার সোশ্যাল মিডিয়া খুলে।

এইবার সে একটা ছবি পোস্ট করে-

কোনো ফিল্টার ছাড়া,

কোনো সাজানো দৃশ্য ছাড়া।

ক্যাপশন লিখে-

“বৈশাখকে খুঁজে পাইনি শহরের ভিড়ে,

তাই গ্রামে গিয়ে ফিরিয়ে আনলাম নিজের হাতে।” 

গতবছরের স্মৃতিটা আজকে তার বড় বেশি মনে দোলা দিচ্ছে ইট পাথরের চার দেওয়ালের মাঝে বন্দী মনে শহরের বৈশাখী ঝড় তোলে।