এআই কি মানুষের সৃজনশীলতাকে বাড়াবে, নাকি ধীরে ধীরে মানুষের অনুভূতি, পছন্দ ও অভিপ্রায়ের ওপরও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে? জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সে গাদি সাসুনের পরিবেশনা সেই অস্বস্তিকর প্রশ্নটিকেই শিল্পের ভাষায় সামনে এনেছে। -এ এইচ এম বজলুর রহমান জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স থেকে, জেনেভা, সুইজারল্যান্ড জাতিসংঘের একটি সম্মেলনকক্ষ সাধারণত শব্দের জায়গা। রাষ্ট্রদূতেরা কথা বলেন। নীতিনির্ধারকেরা সতর্ক করেন। গবেষকেরা তথ্য উপস্থাপন করেন। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা সম্ভাবনার কথা বলেন। নাগরিক সমাজ জবাবদিহির প্রশ্ন তোলে। কিন্তু হঠাৎ সেই কক্ষে সংগীত ঢুকে পড়লে কী ঘটে?সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্সের উদ্বোধনী পর্বে মিলানভিত্তিক সুরকার ও ট্রান্সমিডিয়া শিল্পী গাদি সাসুন যখন পরিবেশনা শুরু করলেন, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে চলমান বিতর্ক যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য নীতিপত্রের ভাষা ছেড়ে মানুষের অনুভূতির জগতে প্রবেশ করল। জাতিসংঘের নিজস্ব ভিডিও ও শটলিস্টে সাসুনের পরিবেশনা এবং তা দেখছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, আইটিইউ মহাসচিব ডোরিন বগদান-মার্টিন ও জাতিসংঘের ডিজিটাল ও উদীয়মান প্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ দূত আমানদীপ সিং গিল, এমন দৃশ্য নথিভুক্ত হয়েছে। সাসুন কোনো বক্তৃতা দিচ্ছিলেন না। কিন্তু তাঁর সংগীত, মানবদেহের অঙ্গভঙ্গি, ডিজিটাল প্রতিক্রিয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নির্মিত সৃজনশীল সম্পর্ক একটি প্রশ্ন তুলছিল। এআই কি মানুষের সৃজনশীলতার সহযোগী হবে, নাকি একদিন মানুষের আবেগের ব্যাখ্যাকারী, প্রভাবক এবং শেষ পর্যন্ত নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠবে?
এই প্রশ্নটি এখন আর কেবল শিল্পের প্রশ্ন নয়। এটি এআই গভর্ন্যান্সের প্রশ্ন। যে মুহূর্তে সংগীত নীতির আলোচনায় ঢুকে পড়ে জাতিসংঘের প্রথম গ্লোবাল ডায়ালগ অন এআই গভর্ন্যান্স এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন এআই নিয়ে বৈশ্বিক বিতর্ক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। প্রশ্ন এখন আর শুধু এআই কী করতে পারে, তা নয়। জাতিসংঘের ভাষায়, মূল প্রশ্ন হলো, এই রূপান্তরকে বিশ্ব সম্মিলিতভাবে পরিচালনা করবে, নাকি প্রযুক্তিই শেষ পর্যন্ত আমাদের পরিচালনা করবে। ডায়ালগের আলোচনাকে চারটি বড় পরিসরে সাজানো হয়েছে: এআইয়ের সামাজিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও প্রযুক্তিগত প্রভাব; এআই বিভাজন কমানো; নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য এআই; এবং মানবাধিকার, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও শক্তিশালী মানবিক তদারকি। এই চারটি বিষয় সাধারণত নীতি ও প্রযুক্তির ভাষায় আলোচিত হয়। সাসুন যেন সেখানে পঞ্চম একটি ভাষা যোগ করলেন: অনুভূতি।
শাস্ত্রীয় সংগীতে প্রশিক্ষিত এই সুরকারের কাজকে কেবল ইলেকট্রনিক সংগীতের প্রচলিত ঘরানায় রাখা কঠিন। অর্কেস্ট্রাল কম্পোজিশন, লাইভ পারফরম্যান্স, ইনস্টলেশন আর্ট এবং এজেন্টিক এআইয়ের সংযোগস্থলে তাঁর কাজ। আইটিইউর AI for Good-এর শিল্পী পরিচিতিতে তাঁকে এমন একজন সুরকার ও ট্রান্সমিডিয়া শিল্পী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যিনি এই চারটি ক্ষেত্রের সংযোগ নিয়ে কাজ করেন। এখানে ‘এজেন্টিক এআই’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। সহজভাবে বললে, এটি এমন এআই ব্যবস্থার ধারণা, যা শুধু একটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থেমে থাকে না। নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের দিকে একাধিক ধাপে কাজ করতে, বিভিন্ন তথ্য বা টুল ব্যবহার করতে এবং কোনো কাজের পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করতে পারে। এ ধরনের প্রযুক্তি যখন একটি অফিসের কাজ সম্পন্ন করে, তখন প্রশ্ন হয় দক্ষতার। কিন্তু সেই প্রযুক্তি যখন মানুষের কণ্ঠ, অঙ্গভঙ্গি, আবেগ বা সৃজনশীল সংকেতের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে শুরু করে, তখন প্রশ্নটি বদলে যায়।
মেশিন আমাদের কতটা বুঝবে? আরও কঠিন প্রশ্ন হলো: আমরা কি বুঝতে পারব, মেশিন আমাদের কীভাবে বদলে দিচ্ছে? ‘মোডস অব ভাইব্রেশন’: অ্যালবাম নয়, একটি ব্যবস্থা গাদি সাসুনের ২০২৫ সালের কাজ Modes of Vibration এই প্রশ্নের একটি শিল্পসম্মত অনুসন্ধান। প্রকল্পটি নিওক্ল্যাসিক্যাল সংগীত, সাউন্ড স্কাল্পচার এবং বিশেষভাবে নির্মিত এআই এজেন্টকে একত্র করেছে। AI for Good-এর তথ্য অনুযায়ী, এটি ২০২৫ সালের সম্মেলনের সমাপনী অডিওভিজ্যুয়াল পরিবেশনা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু কাজটির আকর্ষণ শুধু প্রযুক্তিগত জটিলতায় নয়। সাসুন শব্দকে এমনভাবে ব্যবহার করেন, যেন সংগীত কোনো স্থির রচনা নয়, বরং একটি জীবন্ত সম্পর্ক। মানুষের তৈরি সংকেত, সংগীতের গতি, আবেগের সম্ভাব্য ইঙ্গিত এবং মেশিনের প্রতিক্রিয়া পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়। অর্থাৎ, শিল্পী শুধু একটি যন্ত্র বাজাচ্ছেন না।
