ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজের কিংবদন্তি ক্রিকেটার স্যার গ্যারি সোবার্স আর নেই। শুক্রবার (১৭ জুলাই) সন্ধ্যায় ৮৯ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়েছে। ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং তিন বিভাগেই অসাধারণ দক্ষতার জন্য তিনি ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের সেরাদের একজন হিসেবে বিবেচিত হন। দ্য গার্ডিয়ান স্যার গ্যারি সোবার্সের মৃত্যুতে বিশ্ব ক্রিকেটে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আধুনিক ক্রিকেটে অলরাউন্ডারের সংজ্ঞা যাদের হাত ধরে নতুন মাত্রা পেয়েছে, তাদের মধ্যে সোবার্স অন্যতম। প্রয়াত কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার ও সাবেক অস্ট্রেলিয়ান অধিনায়ক রিচি বেনো তাকে একবার আখ্যায়িত করেছিলেন, বিশ্ব ক্রিকেটে দেখা সর্বকালের সেরা অলরাউন্ডার হিসেবে। বেনোর ভাষায়, সোবার্স ছিলেন অসাধারণ ব্যাটসম্যান, দুর্দান্ত ফিল্ডার এবং এমন একজন বোলার, যিনি নতুন বল, বাঁহাতি স্পিন ও রিস্ট স্পিন সব ধরনের বোলিংয়েই সমান কার্যকর ছিলেন। ১৯৩৬ সালে বার্বাডোসে জন্ম নেয়া সোবার্স মাত্র ১৬ বছর বয়সে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক করেন। ১৯৫৩ সালে বার্বাডোসের হয়ে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেকের পর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তার অসাধারণ প্রতিভা তাকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে জায়গা করে দেয়। ১৯৫৪ সালে টেস্ট অভিষেকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে যাত্রা শুরু করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা কেন উইলিয়ামসনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে তার বেশি সময় লাগেনি। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে কিংস্টনে খেলেন ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরির ইনিংস। সেই ম্যাচে অপরাজিত ৩৬৫ রান করে তিনি এক ইনিংসে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত রানের বিশ্বরেকর্ড গড়েন। প্রায় ৩৬ বছর ধরে অক্ষুণ্ন থাকা সেই রেকর্ড ১৯৯৪ সালে ভাঙেন আরেক ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কিংবদন্তি ব্রায়ান লারা। সোবার্সের ক্যারিয়ারের আরেকটি অবিস্মরণীয় অধ্যায় ১৯৬৮ সালে। ইংল্যান্ডের ওয়েলসের সোয়ানসিতে গ্ল্যামরগানের সেন্ট হেলেন্স মাঠে প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটে টানা এক ওভারের ছয়টি বলেই ছয়টি ছক্কা হাঁকিয়ে ইতিহাস গড়েন তিনি।
ক্রিকেটে ছয় বলে ছয় ছক্কার প্রথম স্বীকৃত কীর্তি হিসেবে ঘটনাটি আজও বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে ওয়েস্ট ইন্ডিজের হয়ে ৯৩টি টেস্ট খেলেছেন সোবার্স। ৫৭.৭৮ গড়ে ৮ হাজার ৩২ রান করার পাশাপাশি বল হাতে নিয়েছেন ২৩৫টি উইকেট। ৫ হাজারের বেশি টেস্ট রান করা ব্যাটারদের মধ্যে তার ব্যাটিং গড় এখনো ইতিহাসের অন্যতম সেরা। প্রথম-শ্রেণির ক্রিকেটেও তার পরিসংখ্যান সমান উজ্জ্বল। ৩৮৩ ম্যাচে ২৮ হাজারের বেশি রান করার পাশাপাশি এক হাজারেরও বেশি উইকেট শিকার করেন তিনি। ক্যারিয়ারের শেষ দিকে সাউথ অস্ট্রেলিয়া ও নটিংহ্যামশায়ারের হয়েও খেলেছেন এই কিংবদন্তি। ১৯৭৪ সালে মাত্র ৩৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় জানান সোবার্স।
অবসরের পর তার সিদ্ধান্ত নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে পরের বছর উইজডেন লিখেছিল, শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কারণেই তিনি ক্রিকেট থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। হাঁটুর চোট থাকলেও প্রকৃত অর্থে দীর্ঘ সময় ধরে অতিরিক্ত ক্রিকেট খেলা, বহুমুখী দায়িত্ব পালন এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে দ্রুত ভ্রমণের চাপই তার ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়কে ত্বরান্বিত করেছিল বলে উল্লেখ করা হয় সেই মূল্যায়নে। ক্রিকেটে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৫ সালে ব্রিটিশ রাজপরিবার তাকে নাইট উপাধিতে ভূষিত করে। এরপর থেকে তিনি পরিচিত হন ‘স্যার গ্যারি সোবার্স’ নামে। প্রজন্মের পর প্রজন্মের ক্রিকেটারদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন পূর্ণাঙ্গ অলরাউন্ডারের আদর্শ। তার মৃত্যুতে শুধু ওয়েস্ট ইন্ডিজ নয়, বিশ্ব ক্রিকেট হারাল এমন এক কিংবদন্তিকে, যার কীর্তি ও প্রভাব ক্রিকেট ইতিহাসে চিরকাল অমলিন হয়ে থাকবে।
