আকবর হায়দার কিরণ প্রকাশিত: ০৭ মার্চ, ২০২৬, ০১:২১ পিএম

এম আব্দুর রাজ্জাক, বগুড়া থেকে :
মহান স্বাধীনতার ঘোষক ও বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার কনিষ্ঠ পুত্র এবং বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান এর ছোট ভাই বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক আরাফাত রহমান কোকো’র ১১তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ। ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি দেশের গণআন্দোলনের এক শ্বাসরুদ্ধকার সময়ে মা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া গুলশানের নিজ কার্যালয়ে পুলিশী অবরুদ্ধ থাকাবস্থায় মালয়েশিয়ায় আকস্মিক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন আরাফাত রহমান কোকো। তাঁর অকাল মৃত্যুতে দেশবাসী শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়েছিল। অবরুদ্ধ মা বেগম খালেদা জিয়ার প্রিয় পুত্রের লাশ ধরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিলেন। সরকারের পক্ষে তার লাশ দেখা ও সমবেদনা নিয়ে হয়েছিল ঘৃণ্য রাজনীতির কুটকৌশল। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৪৫ বছর। মৃত্যুর চার দিন পর ২৮ জানুয়ারি মরদেহ দেশে আনা হয়। ঐদিন বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে তাঁর মরদেহ দাফন করা হয়। সাবেক প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর আদরের ছোট সন্তান হলেও কোকোকে দেশ বিদেশের মানুষ প্রথম জানতে পারলো ১/১১-এর সেনাসমর্থিত মইন-ফখরুদ্দীন সরকার কর্তৃক মা বেগম খালেদা জিয়ার সাথে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁর গ্রেফতারের পর থেকেই। রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক ও মানসিকভাবে প্রচন্ড নির্যাতন করে তাকে পঙ্গু করা হয়। নির্যাতনের ফলে কোকোর হৃদযন্ত্রে সমস্যা দেখা দেয়। সে সময়ে সংবাদপত্রের ছবি এবং টিভির ভিডিওগুলোর কথা যাদের মনে আছে তারা হয়তো স্মরণ করতে পারবেন যে, কোকোকে সব সময় বুক চেপে ধরে থাকতে দেখা যেতো। সেই সময় থেকেই তিনি হৃদযন্ত্রের সমস্যায় ভুগছিলেন। ২০০৮ সালের ১৭ জুলাই জামিনে মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য সপরিবারে থাইল্যান্ডে যান কোকো। সেখান থেকে তিনি মালয়েশিয়ায় যান, স্ত্রী ও দু’কন্যাসহ মালয়েশিয়াতেই অবস্থান করছিলেন। একদিকে বিদেশে তিনি গুরুতর অসুস্থ ছিলেন, অন্যদিকে দেশে মা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর সরকারের অত্যাচার-নির্যাতনের খবরে তিনি ছিলেন চরম দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এ অবস্থায় তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন।
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ঘর আলোকিত করে ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট আরাফাত রহমান কোকো জন্মগ্রহণ করেছিলেন। এর কিছুদিন পরই শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। বাবা তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান পাকিস্থান সেনাবাহিনীর সাথে বিদ্রোহ করে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে মুক্তিযুদ্ধ শুরু করে দেন। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর ১৬ মে ১৯৭১ সালে নৌপথে মা বেগম খালেদা জিয়া দুই পুত্রসহ ঢাকায় চলে আসেন। বড় বোন খুরশীদ জাহানের বাসায় ১৭ জুন পর্যন্ত থাকেন সপরিবারে। ২ জুলাই ১৯৭১ সিদ্ধেশ্বরীতে এস আব্দুল্লাহর বাসা থেকে পাকিস্তানী সেনারা দুই পুত্র- তারেক রহমান ও আরাফাত রহমান কোকোসহ মা বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করে। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বন্দী ছিলেন। ১৬ ডিসেম্বর ’৭১ বাংলাদেশ স্বাধীন হলে মা-ভাইসহ কোকোও মুক্তি পান। ১৯৮১ সালের ৩০ মে পিতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান একদল বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে শহীদ হবার পর মা বেগম খালেদা জিয়ার একক স্নেহ, ভালোবাসা ও সার্বিক তত্ত্বাবধানে বড় হয়ে উঠেন আরাফাত রহমান কোকো। ছোটকাল থেকেই চুপচাপ স্বভাবের কারণেই তার উপর মা’র দুর্বলতাটা একটু বেশিই ছিলো। রাজনৈতিক পরিবারে তার জন্ম হলেও তিনি রাজনীতিক হিসেবে নয়, একজন ব্যবসায়ী ও ক্রীড়া সংগঠক হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। ব্যবসা, ক্রীড়া ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেই নিজেকে সর্বদা নিয়োজিত রেখেছিলেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সন্তান হয়েও তার মধ্যে কোনো অহংকার ছিল না। একজন সাধারণ মানুষের মত তিনি জীবনযাপন করতেন। মিতবাক, সজ্জন এবং সাদাসিধে এ মানুষটার খুব ঘনিষ্ঠজনরা জানেন তার সাদাসিধে জীবন সম্পর্কে। একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ছেলে হয়েও নব্বইয়ের দশকে তিনি বাকিতে মোটরসাইকেলের তেল কিনতেন। অবিশ্বাস্য মনে হতেই পারে। এছাড়া তিনি মাঝেমধ্যেই খেলনা আর চকলেট নিয়ে পথশিশুদের কাছে ‘সারপ্রাইজ’ হিসেবে হাজির হতেন। তাদের সাথে ক্রিকেট খেলতেন। মালয়েশিয়াতে অবস্থানকালেও তিনি খুবই সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। একটি দুই বেডের ভাড়া বাসায় স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে থাকতেন। নিজেই প্রতিদিন দুই মেয়েকে স্কুলে নিয়ে যেতেন এবং নিয়ে আসতেন । বিনয়ী ও প্রচারবিমুখ কোকোর চরম শত্রুরাও তার ব্যক্তি চরিত্রের কোনো ত্রুটির কথা বলতে পারবেন না।
ক্রিকেটপ্রেমী হিসেবে বাংলাদেশের ক্রিকেটের উন্নয়নে এ ক্রিকেটপ্রেমী ছুটে বেড়িয়েছিলেন শহর থেকে গ্রামে। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে ২০০৩ সালে কাজ শুরু করেছিলেন তিনি। সেই সাথে বিসিবির একজন সদস্যও ছিলেন তিনি। ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য যে কর্মসূচি শুরু করেছিলেন তিনি বর্তমানে তার সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল। জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলোয়াড় তৈরি করার জন্য ক্রিকেটকে জেলা থেকে শুরু করে উপজেলা- গ্রাম পর্যায়ে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। তাছাড়া তিনি মোহামেডান ক্লাবের এক্সিকিউটিভ কমিটির কালচারাল সেক্রেটারি ছিলেন। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাথে যুক্ত হওয়ার পর ক্রিকেটের অনেক উন্নয়ন করেছেন তিনি। ক্রিকেটের উন্নয়নের জন্য যা যা করার তাই করেছেন মরহুম এই ক্রীড়াপ্রেমী।