খবর প্রকাশিত: ০৫ জুলাই, ২০২৬, ১১:৩০ পিএম

৪ জুলাই স্বাধীনতার ঘোষণা। আর ৫ জুলাই প্রিয় আকবর হায়দার কিরনের জন্মদিন। দুটি তারিখ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কখনো কেবল ক্যালেন্ডারের ঘটনা নয়। ইতিহাস মানুষের জীবন, পরিচয়, স্মৃতি, সংগ্রাম, প্রবাস, উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ ভাবনার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকে। আকবর হায়দার কিরনের “দুটি ইতিহাসের মিলন: ২৫০ বছরের আমেরিকা, বাংলার উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের সংলাপ” লেখাটি সেই অর্থে একটি সময়োপযোগী ও চিন্তাজাগানিয়া প্রয়াস। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিকে শুধু একটি রাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যাপন হিসেবে দেখেননি। বরং এর সঙ্গে যুক্ত করেছেন বাংলার পলাশীর ইতিহাস, ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের বিস্তার, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্থান, সাম্রাজ্য রাজনীতির নির্মম বাস্তবতা এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান সাংবাদিক, লেখক ও অভিবাসীর আত্মপরিচয়ের অভিজ্ঞতা।
এখানেই লেখাটির বিশেষ গুরুত্ব। কারণ ইতিহাসকে যদি শুধু আলাদা আলাদা ঘটনা হিসেবে দেখা হয়, তাহলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না। ১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ এবং ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা ঘোষণা ভৌগোলিকভাবে দূরের ঘটনা। একটি ঘটেছিল বাংলার মাটিতে, অন্যটি উত্তর আমেরিকায়। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাসের বৃহত্তর ধারায় এই দুই ঘটনার মধ্যে গভীর সংযোগ আছে। পলাশীর পর বাংলার সম্পদ, বাণিজ্য ও রাজস্বের ওপর ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করে। আর সেই একই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলো স্বাধীনতার সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। ফলে বাংলা ও আমেরিকার ইতিহাসকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। একদিকে উপনিবেশ বিস্তারের ইতিহাস, অন্যদিকে উপনিবেশ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, দুইই একই বিশ্ব-বাস্তবতার অংশ।
আকবর হায়দার কিরনের লেখার শক্তি হলো, তিনি এই সংযোগকে আবেগ, স্মৃতি ও বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলের জায়গা থেকে দেখেছেন। তাঁর কাছে আমেরিকার ২৫০ বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাস নয়; এটি স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, অভিবাসী মানুষের অবদান, বহুসংস্কৃতির বিকাশ এবং নতুন পরিচয় নির্মাণের ইতিহাস। একই সঙ্গে এটি বাংলার মানুষের জন্যও ভাবনার বিষয়। কারণ বাংলা নিজেও উপনিবেশ, শোষণ, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার দীর্ঘ ইতিহাস বহন করে। তবে ইতিহাসের আলোচনায় একটি সতর্কতা জরুরি। আমরা অনেক সময় ইতিহাসকে শুধু উদ্যাপনের বিষয় বানিয়ে ফেলি। পতাকা, অনুষ্ঠান, স্মারকগ্রন্থ, বক্তৃতা, ব্যাকড্রপ ও আনুষ্ঠানিকতার ভেতর ইতিহাসকে বন্দী করি। কিন্তু ইতিহাস শুধু গৌরবের গল্প নয়; ইতিহাস প্রশ্নেরও জায়গা। স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন আশা জাগায়, তেমনি তা আমাদের সামনে অস্বস্তিকর সত্যও তুলে ধরে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা মানবসভ্যতার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি বড় মাইলফলক।
এটি আধুনিক রাষ্ট্র, গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও আত্মনিয়ন্ত্রণের ধারণাকে নতুন শক্তি দিয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সেই ইতিহাসের ভেতরে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর দমন, দাসপ্রথার নিষ্ঠুরতা, বর্ণবৈষম্যের দীর্ঘ ছায়া এবং নাগরিক অধিকারের অসম বাস্তবতাও রয়েছে। তাই ইতিহাসের পাঠ হতে হবে আনন্দের, কিন্তু অন্ধ আনন্দের নয়; হতে হবে তথ্যনিষ্ঠ, মানবিক ও আত্মসমালোচনামূলক। একই কথা বাংলার ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। পলাশীকে আমরা প্রায়ই বিশ্বাসঘাতকতা, পরাজয় ও উপনিবেশবাদের সূচনা হিসেবে দেখি। সেটি সত্য। কিন্তু শুধু আবেগ দিয়ে পলাশী বোঝা যায় না। পলাশীর পেছনে ছিল আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, বাণিজ্যিক স্বার্থ, অভ্যন্তরীণ বিভাজন, সামরিক দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রাজনীতির জটিলতা। পলাশী আমাদের শুধু পরাজয়ের কথা বলে না; এটি আমাদের সতর্ক করে দেয় যে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, জ্ঞান, সামরিক প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক ঐক্য দুর্বল হলে বাইরের শক্তি খুব সহজেই ভেতরের বিভাজনকে ব্যবহার করতে পারে।
এই জায়গায় আকবর হায়দার কিরনের লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের আলোচনায় ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন। ড. মুস্তফা সরওয়ারের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ টেলিফোন আলাপচারিতা এবং সেটিকে “কফি উইথ কিরন” অনুষ্ঠানের বিশেষ পর্ব হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনা প্রশংসনীয়। ইতিহাস শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বা গবেষণাগারের নথিতে সীমাবদ্ধ থাকলে সাধারণ মানুষের কাছে তা প্রাণহীন হয়ে পড়ে। ইতিহাসকে জীবন্ত করতে হলে তা গণমাধ্যমে, আলোচনায়, প্রবাসী সমাজে, পরিবারে, শিক্ষাঙ্গনে এবং তরুণ প্রজন্মের কৌতূহলের ভেতর ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের জন্য এই আলোচনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। অভিবাসীরা শুধু এক দেশ থেকে আরেক দেশে যান না; তাঁরা সঙ্গে করে নিয়ে যান ভাষা, স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আঘাতের উত্তরাধিকার। একই সঙ্গে তাঁরা নতুন দেশের নাগরিক জীবন, গণতান্ত্রিক অভিজ্ঞতা, বহুসংস্কৃতির বাস্তবতা এবং নতুন প্রজন্মের পরিচয় সংকটের মধ্যেও বাস করেন।
তাই একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান লেখকের চোখে বাংলা ও আমেরিকার ইতিহাসের মিলন দেখা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু অতীতের আলোচনা নয়; এটি পরিচয়ের আলোচনাও। বাংলাদেশি-আমেরিকান Media Foundation-এর উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত সম্মাননা অনুষ্ঠানের কথাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সংখ্যার তাৎপর্য কখনো কেবল গণনায় সীমাবদ্ধ থাকে না। “২৫০” এখানে একটি প্রতীক। এটি স্বাধীনতার দীর্ঘ যাত্রা, অভিবাসীদের অবদান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের সংগ্রাম, বহুসাংস্কৃতিক সমাজের বিকাশ এবং একই সঙ্গে অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির স্মারক। কারণ কোনো গণতন্ত্রই চূড়ান্ত নয়। গণতন্ত্রকে প্রতিদিন নতুন করে রক্ষা করতে হয়, প্রশ্ন করতে হয়, সংশোধন করতে হয় এবং মানুষের অধিকারের সঙ্গে যুক্ত করতে হয়। আজকের পৃথিবীতে ইতিহাসের এ ধরনের সংলাপ আরও জরুরি। কারণ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং দ্রুত বদলে যাওয়া রাজনীতি মানুষের স্মৃতি ও জ্ঞানের ধরন বদলে দিচ্ছে।
তরুণ প্রজন্ম অনেক কিছু দ্রুত জানে, কিন্তু সব সময় গভীরভাবে বোঝে না। ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত ভিডিও দেখা সহজ, কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ প্রেক্ষাপট বোঝা কঠিন। ফলে ইতিহাসকে নতুন ভাষায়, নতুন মাধ্যমে, কিন্তু দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপন করা জরুরি। “কফি উইথ কিরন” যদি এই দায়িত্ব পালন করতে পারে, তবে এটি শুধু একটি অনুষ্ঠান থাকবে না; এটি প্রজন্মের সঙ্গে ইতিহাসের সংলাপ হয়ে উঠতে পারে। এই আলোচনার আরেকটি বড় শিক্ষা হলো, স্বাধীনতা কোনো এক দিনের অর্জন নয়। স্বাধীনতার ঘোষণা থাকে, কিন্তু স্বাধীনতার বাস্তবায়ন দীর্ঘ প্রক্রিয়া। ১৭৭৬ সালের ঘোষণার পরও যুক্তরাষ্ট্রকে নাগরিক অধিকার, দাসপ্রথা বিলোপ, নারীর ভোটাধিকার, বর্ণসমতা, অভিবাসী অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষার দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়েছে। বাংলাদেশও ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, কিন্তু ন্যায়, গণতন্ত্র, সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও জবাবদিহির সংগ্রাম এখনও চলমান। তাই ইতিহাসের সত্যিকারের শিক্ষা হলো, স্বাধীনতাকে শুধু স্মরণ করলেই হয় না; স্বাধীনতার নৈতিক দাবি পূরণ করতেও হয়।
আজকের আহ্বান তাই স্পষ্ট। বাংলা ও আমেরিকার ইতিহাসকে বিচ্ছিন্ন নয়, বরং বিশ্ব ইতিহাসের পরস্পরসংযুক্ত অধ্যায় হিসেবে পড়তে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়, গণমাধ্যম, গবেষক, প্রবাসী সংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং তরুণ প্রজন্মকে এ ধরনের আলোচনায় আরও সক্রিয় হতে হবে। শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্যাপন নয়, প্রয়োজন গবেষণা, সংলাপ, দলিলভিত্তিক আলোচনা, অনুবাদ, প্রামাণ্যচিত্র, স্মারক প্রকাশনা এবং জনসম্পৃক্ত ইতিহাসচর্চা। প্রিয় আকবর হায়দার কিরন ভাই, আপনার জন্মদিন এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছরের এই ঐতিহাসিক মুহূর্ত একসঙ্গে জীবন, ইতিহাস ও মানবিকতার এক সুন্দর মিলন হয়ে উঠেছে। আপনার লেখাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ইতিহাস কেবল অতীতের ধুলো জমা অধ্যায় নয়; ইতিহাস বর্তমানকে প্রশ্ন করে, ভবিষ্যৎকে সতর্ক করে এবং মানুষকে নিজের অবস্থান নতুন করে ভাবতে শেখায়। Happy happy Birthday, Dear আকবর হায়দার কিরন। আপনার কলম, চিন্তা, সংলাপ ও ইতিহাসচর্চা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও আলোকিত করুক। ইতিহাসের এই সেতুবন্ধন আরও বিস্তৃত হোক, বাংলা ও আমেরিকার অভিজ্ঞতা থেকে নতুন প্রজন্ম স্বাধীনতা, ন্যায়, মানবিকতা ও গণতন্ত্রের গভীর পাঠ গ্রহণ করুক।