কিছু কিছু কণ্ঠস্বর শুধু সংবাদ পাঠ করে না; তারা হয়ে ওঠে একটি প্রজন্মের স্মৃতি, বিশ্বাস এবং ইতিহাসের অংশ। বাংলা ভাষাভাষী কোটি মানুষের কাছে রোকেয়া হায়দারের কণ্ঠস্বর ঠিক তেমনই এক পরিচিত ও নির্ভরতার প্রতীক।  ইন্টারনেট ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আগের যুগে, বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর, ইউরোপ থেকে আমেরিকা—অসংখ্য মানুষ রেডিওর সামনে বসে অপেক্ষা করতেন বিশ্বের খবর জানার জন্য। সেই সময়ে নির্ভরযোগ্য সংবাদ, বিশ্লেষণ এবং বিশ্বপরিস্থিতির খবর পৌঁছে দিতেন যে কয়েকজন কিংবদন্তি সম্প্রচারক, তাঁদের মধ্যে রোকেয়া হায়দার ছিলেন অন্যতম উজ্জ্বল নাম।  চট্টগ্রাম বেতার থেকে তাঁর সম্প্রচার জীবনের শুরু। পরে বাংলাদেশ বেতার ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে কাজ করে তিনি সাংবাদিকতা ও সংবাদ উপস্থাপনায় নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের ভয়েস অব আমেরিকা (ভিওএ) বাংলা বিভাগে যোগ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রচার জগতে এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছান। একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে তিনি এমন সময়ে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করেন, যখন গণমাধ্যমের উচ্চপর্যায়ে নারীদের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। মেধা, পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে তিনি শুধু নিজের জন্য নয়, পরবর্তী প্রজন্মের নারী সাংবাদিকদের জন্যও একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ভিওএ বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি ইতিহাসের অংশ হয়ে আছেন।  তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের অন্যতম স্মরণীয় অধ্যায় হলো মানবতার প্রতীক মাদার তেরেসার একান্ত সাক্ষাৎকার গ্রহণ। বিশ্ববরেণ্য এই নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে তাঁর সেই সাক্ষাৎকার আজও বাংলা সম্প্রচার জগতের এক মূল্যবান সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়।  রোকেয়া হায়দার শুধু সংবাদ কক্ষে সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তিনি কভার করেছেন একাধিক ফুটবল বিশ্বকাপ এবং অলিম্পিক গেমস। বিশ্বের বৃহত্তম ক্রীড়া আসরগুলোতে উপস্থিত থেকে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে বাংলা সাংবাদিকতার মর্যাদা বৃদ্ধি করেছেন। তাঁর আরেকটি বিশেষ পরিচয় হলো শাড়ি। পৃথিবীর নানা দেশে, আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠান, কূটনৈতিক সমাবেশ কিংবা বিশ্বকাপের মাঠে—রোকেয়া হায়দারকে প্রায়শই দেখা গেছে শাড়ি পরিহিত অবস্থায়। আধুনিক আন্তর্জাতিক সম্প্রচার জগতের একজন শীর্ষস্থানীয় পেশাজীবী হয়েও তিনি বাঙালি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে গর্বের সঙ্গে ধারণ করেছেন। অনেকের কাছে তিনি শাড়ির সৌন্দর্য ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য প্রতীক।  মানবিক উদ্যোগেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। ভিওএ-তে রোহিঙ্গা ভাষা সেবা চালুর ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাস্তুচ্যুত ও নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কাছে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার এই উদ্যোগ তাঁর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির উজ্জ্বল উদাহরণ।  বাংলাদেশে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতার আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় ছিল ঢাকা জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠান।ভিওএ ফ্যান ক্লাব ফেডারেশনের সভাপতি প্রয়াত যুবরাজ চৌধুরীর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত সেই সংবর্ধনায় দেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও শুভানুধ্যায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল তাঁর প্রতি মানুষের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ।  সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলায় তিনি বহুবার আহ্বায়ক, উপদেষ্টা ও বিশেষ অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর উপস্থিতি বইমেলাকে দিয়েছে বিশেষ মর্যাদা ও অনুপ্রেরণা।  সম্প্রতি তাঁর দীর্ঘ ও গৌরবময় কর্মজীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলাদেশি আমেরিকান মিডিয়া ফাউন্ডেশন (বিএএমএফ) অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬-এর অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ সম্মাননা লাভ করেছেন। সাংবাদিকতা, সম্প্রচার, সংস্কৃতি ও কমিউনিটি সেবায় তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে এই সম্মাননা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।চলতি বছর নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে অনুষ্ঠিত বাংলা নববর্ষ উদযাপনের আহ্বায়ক হিসেবেও তিনি সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর নেতৃত্বে হাজারো প্রবাসী বাঙালির মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল এই উৎসব।  তবে পুরস্কার, পদ বা অর্জনের তালিকাই রোকেয়া হায়দারের প্রকৃত পরিচয় নয়। তাঁর প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে আছে কোটি মানুষের স্মৃতিতে, শ্রোতাদের ভালোবাসায় এবং অসংখ্য তরুণ সাংবাদিকের অনুপ্রেরণায়।  তিনি শুধু একজন সংবাদকর্মী নন; তিনি একটি প্রতিষ্ঠান। তিনি শুধু একজন সম্প্রচারক নন; তিনি বাংলা ভাষার গণমাধ্যম ইতিহাসের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।

 আজ তাঁর জন্মদিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাঁর অসাধারণ অবদান, পেশাদারিত্ব, নেতৃত্ব এবং মানবিক মূল্যবোধকে।  রোকেয়া হায়দারের কণ্ঠস্বর পেরিয়েছে মহাসাগর, ছুঁয়েছে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে। তাঁর কাজ অতিক্রম করেছে ভৌগোলিক সীমানা, আর তাঁর উত্তরাধিকার আগামী দিনেও আলোকিত করবে বাংলা সাংবাদিকতা ও সম্প্রচার জগতকে।  শুভ জন্মদিন, রোকেয়া হায়দার। আপনি আমাদের গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা, আমাদের সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্প্রচার ব্যক্তিত্ব।