এএ্ইচএম বজলুর রহমান প্রকাশিত: ২৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:০৭ এএম

এ এইচ এম বজলুর রহমান
আকবর হায়দার কিরণের দ্য স্মেল অব লেটার্স স্মৃতি, যোগাযোগ এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কিছু মানবিক অনুভূতির কোমল অন্বেষণ। হাতে লেখা চিঠি, শর্টওয়েভ রেডিও ও ডাকপিয়নের সাইকেল থেকে স্মার্টফোনের নীল পর্দায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে কবিতাটি একটি জরুরি প্রশ্ন তোলে: যোগাযোগ দ্রুত হয়েছে, কিন্তু মানুষ কি সত্যিই আরও কাছাকাছি এসেছে? কবিতাটির সবচেয়ে বড় শক্তি এর ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য চিত্রকল্পে। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা, রঙিন খাম, কিউএসএল কার্ড, কালির গন্ধ, কাগজের উষ্ণতা—এসব অনুষঙ্গ অতীতকে কেবল স্মৃতি হিসেবে নয়, জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে ফিরিয়ে আনে। কবি শুধু বলেননি যে চিঠি একসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল; তিনি চিঠিকে ঘিরে থাকা অপেক্ষা, উত্তেজনা ও আবেগের পুরো পরিবেশটি পুনর্নির্মাণ করেছেন। তখন অপেক্ষাও ছিল যোগাযোগের অংশ। দূরত্ব শব্দের মূল্য বাড়িয়ে দিত। নদী, সমুদ্র ও মহাদেশ পেরিয়ে আসা কয়েকটি হাতে লেখা বাক্যের মধ্যে লুকিয়ে থাকত সময়, মনোযোগ ও আন্তরিকতার প্রমাণ। প্রেরক শুধু একটি বার্তা পাঠাতেন না; তিনি নিজের উপস্থিতির এক অংশ পাঠাতেন।
শর্টওয়েভ রেডিওর উল্লেখ কবিতাটিকে একটি স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক মাত্রা দিয়েছে। এটি অস্পষ্ট কোনো নস্টালজিয়া নয়। বরং এমন এক সময়ের স্মরণ, যখন বেতারতরঙ্গ, শ্রোতা ক্লাব, কিউএসএল কার্ড ও পেন-পালের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব গড়ে উঠত। বাংলাদেশ থেকে ভারত, ইউরোপ, তারপর অচেনা পশ্চিমা দেশে কবিতার যাত্রা ইন্টারনেট-পূর্ব বিশ্বের বিস্ময়কে ধারণ করে। কবিতাটির অন্যতম শক্তিশালী উপলব্ধি হলো, তাৎক্ষণিক যোগাযোগের ব্যবস্থা না থাকলেও পৃথিবী একসময় মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি মনে হতো। এই আপাতবিরোধেই কবিতার মূল বক্তব্য নিহিত। মানুষের নৈকট্য শুধু গতি দিয়ে মাপা যায় না। মুহূর্তে পৌঁছে যাওয়া একটি বার্তার চেয়ে বহুদিন অপেক্ষার পর পাওয়া একটি চিঠি কখনো কখনো বেশি গভীর আবেগ বহন করে। ডিজিটাল জীবনের সমালোচনাও কবিতায় আক্রমণাত্মক নয়, বরং বিষণ্ন ও সংযত। ট্রেন, বাস কিংবা বিমানে মানুষের হাতে বই বা ভাঁজ করা চিঠি নেই; সবার চোখ নত হয়ে আছে নীল আলোয়। এই পরিচিত দৃশ্যটি শুধু বিভ্রান্তির নয়, বাস্তবতার সঙ্গে আমাদের বদলে যাওয়া সম্পর্কেরও প্রতীক। আমরা যেন পৃথিবীকে সরাসরি না দেখে পর্দায় ধরা তার প্রতিচ্ছবিই বেশি দেখি।
তবে কবিতাটি কোথাও কোথাও অতীতকে অতিরিক্ত নির্মল করে দেখিয়েছে। চিঠি অন্তরঙ্গ ছিল, কিন্তু তা ধীর, অনিশ্চিত এবং অনেকের জন্য অপ্রাপ্যও ছিল। ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রবাসী পরিবার, দূরে থাকা মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যোগাযোগকে সহজ করেছে। এই অর্জনগুলোর স্বীকৃতি থাকলে কবিতার সমালোচনা আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও শক্তিশালী হতো। কিছু জায়গায় পুনরুক্তিও আছে। অতীতের অন্তরঙ্গতা ও বর্তমানের তাৎক্ষণিকতার তুলনা কিছুটা সংক্ষিপ্ত করলে ডাকপিয়নের ঘণ্টা, পুরোনো খাম ও নীল আলোর মতো শক্তিশালী চিত্রগুলো আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারত। তবু কবিতার শেষাংশ অত্যন্ত সংযত ও সুন্দর। কিছু চিঠি কখনো পুরোনো হয় না, কারণ সেগুলো শুধু শব্দ সংরক্ষণ করে না; সংরক্ষণ করে হাতের লেখা, দ্বিধা, স্পর্শ ও সময়। দ্য স্মেল অব লেটার্স প্রযুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে না। এটি মূলত ধৈর্য, মনোযোগ ও আবেগের গভীরতা হারানোর বেদনা প্রকাশ করে। কবিতাটির স্থায়ী প্রশ্ন হলো, স্মার্টফোন কি চিঠির চেয়ে ভালো—তা নয়; বরং সুবিধা কি আমাদের বেশি যোগাযোগ করতে শিখিয়েছে, কিন্তু কম অনুভব করতে বাধ্য করেছে?