২৫১ বছরেও আমেরিকা কেন টিকে আছে?  জীবনে প্রথম আমেরিকা ভ্রমনের সময় থেকেই শুনছি আমেরিকার ছোট্ট অঙ্গরাজ্য ‘দেলওয়ার’ হচ্ছে ফাস্ট স্টেট। ষ্টেট বুঝলেও ফাস্ট স্টেট নিয়ে আমার মধ্যে ধোয়াসা ছিল। ২০২৪ সালে ৪ জুলাই তৃতীয় বারের মতন আমেরিকায় এসে ঠাঁই নেই ভাগ্নে মিলন কুমার রায়ের নিউ ইয়র্কের বাসায়। সেদিন ছিল আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস। মিলন বললো- মামা আজ সন্ধ্যায় আপনাকে নিয়ে যাব ফায়ার ওয়ার্কস দেখাতে। বেশ জাঁকজমক অনুষ্ঠান হয়। চলেন আপনার ভালোও লাগবে। এসবে আমার আলস্য নেই। দমকল বাহিনীর কর্মীদের মতন আমি তৈরিই থাকি। ডাক পাওয়া মাত্রই ছুটতেও পারি।

 মিলন, দিপালী বউ’মা, তাদের দু’ছেলে গোপাল আর গৌরাঙ্গকে নিয়ে আলোর মিছিল দেখাতে ছুটে চলছে। আমাদের সাথে আর একটি বাঙালি পরিবার যুক্ত হয়েছে। পথে বিপুল সংখ্যায় মানুষের সমাবেশ। এমনিই নিউইয়র্ক বাঙালিদের নীলক্ষেত গাউছিয়া মার্কেটের মতন জ্যাম আর ভীরে আক্রান্ত থাকে। সেদিন আরও বেশি। সবাই ফায়ার ওয়ার্কস দেখতে বেড়িয়েছে।  জীবনের প্রথম ফায়ার ওয়ার্কস দেখার সুযোগ হয়েছিল পুত্র শাশ্বত গৌরব সিদ্ধার্থের সুবাদে। সাথে মুনিবা বারী (পরে পুত্র বধূ)। ৩১ ডিসেম্বর সেই লাল দুপুরে সিডনী অপেরা হাউস আর হারবার ব্রিজের মাঝে গিয়ে পৌঁছাই নদীর পাড়ে। সেখানে জায়গা পাওয়া অনেক ভাগ্যের।  প্রায় দশ ঘণ্টা আগে পৌঁছাই, অথচ ফায়ার ওয়ার্কস সেই রাত ০০১ মিনিটে। লম্বা সময় অপেক্ষার পালা। প্রথম প্রথম বিরক্ত বোধ হচ্ছিল। এমন কি আছে যে সারা দুনিয়া থেকে ৩১ ডিসেম্বর রাতের এ আয়োজন দেখতে লক্ষ  লক্ষ মানুষ কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে সিডনীতে জমা হয়। পরদিন ১ জানুয়ারি ২০২২ সকালে সিডনী থেকে ঢাকায় ফেরার বিমান। সে এক টেনশন।

এতোসব ভীর ঠেলে বেরুতে বেরুতে আবার বিমান মিস হয় কিনা। যাহোক মানুষের নাচ-গানে দ্রুতই সময় কেটে গিয়ে মধ্যরাতের শূণ্য সময়ে পৌঁছাই। সে এক আলোর মোহনীয় রুপ যার ঝলকানীতে সমগ্র দিনের বিরক্তি আর উৎকণ্ঠা কেটে যায়। লাখো মানুষের আনন্দ উচ্চারণের শব্দে আমরাও হারিয়ে যাই। মনুষ্য সৃষ্ট আলোর বাহারি উপস্থাপন না দেখলে সে মোহনীয় রুপেরও ধারণা করা অসম্ভব।  সেই প্রথম ফায়ার ওয়ার্কস দেখা। যে কারণে একটা বাড়তি আগ্রহ ছিল। অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার আলোর উপস্থাপনের পার্থক্য বোঝার এবং একটা নতুন অভিজ্ঞতা নেয়াটাও লক্ষ্য ছিল।ভ্রমণকালের সাথে মিলিয়ে এরকম ঐতিহাসিক লগ্নগুলো পাওয়া সৌভাগ্যেরও বিষয়।  মিলন নিউইয়র্ক ট্রাফিক পুলিশের সদস্য হওয়ায় বাড়তি সুবিধা ছিল গাড়ী রাখার ও বাধা ছাড়া সামনে যাওয়ার। পূর্ব নির্ধারিত সময়েই আকাশজুড়ে আলোর বিষ্ফোরণ শুরু হলে মানুষের গগণভেদী আনন্দ উচ্চারণ সুরের মূর্ছন্নার মতন লাগছিলো। এক সময় আলো আর আনন্দ উল্লাসের শব্দ কমে এলে আমরা বাড়িমুখী হই। সেবারও স্বাধীনতা দিবস আর ফাস্ট স্টেট নিয়ে কথা শুনি।  এবার অপরিকল্পিতভাবে আমেরিকায় আসা। হঠাৎ করে বিমানে চাপি। ঠাঁই নেই আমাদের পরিবারের মেজ কন্যা ডাঃ অনন্য বর্ণ ও জামাই ডক্টর যোবায়ের হোসেনের বাসায়। তারা থাকে দেলওয়ার স্টেটের কেপিটেলে। আমি ওদের সাথে জেনেভা কোটের বাসায় থাকি।

ওখানে প্রতিটি গাড়ীর নেম প্লেটে লেখা রয়েছে ‘ দেলওয়ার দি ফাস্ট স্টেট অব আমেরিকা’। ভাতিজি জানালো ফাস্ট স্টেট হওয়ার কারণে এখানে সবকিছুতে স্টেট ট্যাক্স কম। ট্যাক্স কম হওয়ায় অন্য স্টেটগুলোর চেয়ে জিনিসপত্রের দামও কম। আশপাশের ষ্টেটের মানুষজন গাড়ী চালিয়ে এখান থেকে বাজার করে নিয়ে যায়। কেউ কেউ অনলাইনেও এখানকার দোকানগুলো থেকে মালছামানার অর্ডার করে। ফাষ্ট ষ্টেটের অনেক সুবিধা। বেশ ভালো লাগার।  আমেরিকা এমন একটি রাষ্ট্র যেটি প্রথম থেকে বর্তমান আকারে ছিল না। শুরুতে আয়তন আকারে বেশ ছোট্ট ছিল। শক্তি বৃদ্ধির সাথে সাথে এর আকার ও আয়তন বেড়েছে। ১৭৭৬ সালে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণযুক্ত ১৩টি রাজ্য ব্রিটিশ রাজাকে অস্বীকার করে ৪ জুলাই স্বাধীনতা ঘোষণা করে। যে ঘোষণারপত্রের প্রধান খসড়াকারক ছিলেন থমাস জেফারসন। যিনি ১৮০১ থেকে ১৮০৯ সাল পর্য়ন্ত তৃতীয় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। থমাস জেফারসনের নেতৃত্বে প্রণিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের দিন ৪ জুলাই। সেদিনটিকে ধরেই আমেরিকার স্বাধীনতা দিবস পালিত হয়। তখন ১৩টি রাজ্য নিয়ে শুরেু হলেও আজ সেটি সংখ্যায় দাঁড়িয়েছে ৫০টি। শক্তিতে পৃথিবীজুড়ে ১ম।  স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে প্রথম স্বাক্ষর করে যে রাজ্য সেটি দেলওয়ার। যে কারণে ফাষ্ট স্টেট। তারপর পেন্সিলভেনিয়া, নিউ জার্সি, জর্জিয়া, কানেক্টিকাট,মেসাচুয়েটাস, মেরিল্যান্ড, সাউথ কেরোলিনা, নিউ হাম্পসপেয়ার, ভার্জিনিয়া, নিউইয়র্ক, নর্থ কেরোলিনা, রহডি আইল্যান্ড এবং প্রভিডেন্স প্লানটেশনস। এই রাজ্যগুলি বা রাষ্ট্রগুলি একত্রে যুক্ত হয়ে গঠন করেন যুক্তরাষ্ট্র।  এদেরকে ফাউন্ডিং ষ্টেটসও বলা হয়।

স্বাধীনতা ঘোষণায় ১৩টি রাজ্যের ৫৬ জন প্রতিনিধি স্বাক্ষর করেন। যাদের মধ্যে ছিলেন সবচেয়ে বিখ্যাত ও প্রভাবশালী জন হ্যানকক। (John Hancock)। যিনি প্রথম ও বড় অক্ষরে নিজ স্বাক্ষর প্রদান করেন।  ৫৬ জন স্বাক্ষরকারী প্রতিনিধিদের নাম স্টেট অনুযায়ী নীচে দেয়া হলো-  ডেলাওয়্যার (Delaware) -সিজার রডনি, জর্জ রিড, থমাস ম্যাককিন। ম্যাসাচুসেটস (Massachusetts)- জন হ্যানকক, স্যামুয়েল অ্যাডামস, জন অ্যাডামস, রবার্ট ট্রিট পেইন, এলব্রিজ গেরি। নিউ হ্যাম্পশায়ার (New Hampshire)- জোসিয়া বার্টলেট, উইলিয়াম হুইপল, ম্যাথিউ থরন্টন। কনেকটিকাট (Connecticut)- রজার শেরম্যান, স্যামুয়েল হান্টিংটন, উইলিয়ামস উইলিয়ামস, অলিভার ওলকট। নিউ ইয়র্ক (New York)-উইলিয়াম ফ্লয়েড, ফিলিপ লিভিংস্টন, ফ্রান্সিস লুইস, লুইস মরিস। নিউ জার্সি (New Jersey)- রিচার্ড স্টকটন, জন উইদারস্পুন, ফ্রান্সিস হপকিনসন, জন হার্ট, আব্রাহাম ক্লার্ক। পেনসিলভানিয়া (Pennsylvania)- রবার্ট মরিস, বেঞ্জামিন রাশ, বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন, জন মর্টন, জর্জ ক্লাইমার, জেমস স্মিথ, জর্জ টেইলর, জেমস উইলসন, জর্জ রস। মেরিল্যান্ড (Maryland)- স্যামুয়েল চেইস, উইলিয়াম পাকা, থমাস স্টোন, চার্লস ক্যারল অব ক্যারলটন। ভার্জিনিয়া (Virginia)- জর্জ উইথ, রিচার্ড হেনরি লি, থমাস জেফারসন, বেঞ্জামিন হ্যারিসন, থমাস নেলসন জুনিয়র, ফ্রান্সিস লাইটফুট লি, কার্টার ব্র্যাক্সটন। উত্তর ক্যারোলিনা (North Carolina)- উইলিয়াম হুপার, জোসেফ হিউজ, জন পেন। দক্ষিণ ক্যারোলিনা (South Carolina)- এডওয়ার্ড রুটলেজ, থমাস হেইওয়ার্ড জুনিয়র, থমাস লিঞ্চ, আর্থার মিডলটন।

জর্জিয়া (Georgia)- বাটন গুইনেট, লাইম্যান হল, জর্জ ওয়ালটন। রোড আইল্যান্ড ও প্রভিডেন্স প্ল্যান্টেশনস (Rhode Island & Providence Plantations) - স্টিফেন হপকিনস, উইলিয়াম এলেরি।  উল্লেখ্য - জন হ্যানকক (John Hancock) ছিলেন ম্যাসাচুসেটস থেকে এবং তিনি কন্টিনেন্টাল কংগ্রেসের সভাপতিও ছিলেন। ১৩টি দেশের যুক্তরাষ্ট্র গঠনের মূলনীতিগুলো ছিল-১# সমতা (Equality), ২# স্বাভাবিক অধিকার (Unalienable Rights)- যেখানে জীবন, স্বাধীনতা ও সুখ অন্বেষন করার অধিকারকে ঈশ্বর প্রদত্ত ও হস্তক্ষেপ অযোগ্য বলে গৃহিত হয়। ৩#. জনগণের শাসন (Government By Consent)-সরকার জনগণের সম্মতিতে প্রতিষ্ঠিত হবে এবং জনগণই ক্ষমতার উৎস। ৪#. সরকারের কাজ নির্ধারণ করা হয় জনগণের অধিকার রক্ষা করা (Purpose of Government)। জুলুমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা (Right to Revolution) সরকার উল্লেখিত কাগুলোকে অস্বীকার করলে তার বিরুদ্ধে জনগণের বিদ্রোহ করার বা সরকার বদলের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে।  ২৫১ বছর পরেও সেগুলো এদেশে জনগণের রক্ষা কবচ হিসেবে টিকে আছে। শুধু তাই নয় বরং ১৩ রাষ্ট্রের ডিক্লারেশন অব ইনডিপেনেডেন্স নীতিগুলোকে অনুসরণ করেই আরও ৩৭টি দেশ পরবর্তীতে যুক্ত হয়ে ৫০ দেশের যুক্তরাষ্ট্রিয় কাঠামো গঠন করে।

 যা আজও ঐক্যে অটুট এবং শক্তিতে বলিয়ান। বিশ্ব্যব্যাপি নানা সমালোচনা থাকলেও পৃথিবীতে অভিবাসীদের পছন্দের তালিকায় আজো আমেরিকাই শীর্ষে।  গত ২৫১ বছরে পৃথিবী থেকে অনেক পুরাতন রাষ্ট্র বিলোপ হয়েছে। নতুন নতুন রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে। সম্মিলিত জাতিপূঞ্জ থেকে আজকের জাতিসংঘে সদস্য রাষ্ট্রের সংখ্যা ২০০ এর ঘরের কাছাকাছি (১৯৩)। ভাঙ্গা গড়ার নানা ইতিহাস রচিত হয়েছে। দুনিয়া জুড়ে ইতিহাসে মার্কিনীদের প্রবল সমালোচনা । পূঁজিবাদী থেকে সমাজতান্ত্রিক, সামন্তবাদী থেকে দাস কত রাষ্ট্র জন্ম নিলো আবার বিলুপ্তও হলো কিন্তু আমেরিকা টিকে থাকলো। শুধু টিকে থাকলোনা বরং আরো বড়ও হলো। আমেরিকার বড় হওয়া এবং টিকে থাকার ‘যাদুর সুত্র’ কি? মার্কিনীরা কি শুধুই গায়ের জোরে টিকে আছে?

গায়ের জোরতো সোভিয়েত ইউনিয়ন, ওয়ারশ জোট, ব্রিটিশ রাজ, ভারতে মোঘল, সুলতান, গুপ্ত , মঙ্গোলিয়ায় চেঙ্গিস খান, ইউরোপের আলেকজান্ডার দি গ্রেট, হিটলার,মুসোলিনী ফ্রানঙ্কো  তাদেরও ছিল। বড় বড় ভূখণ্ডও দখলে ছিল।  ভূখণ্ডের সাথে সাথে তারাও হারিয়ে গেছে বদল হয়েছে সামাজিকও ভৌগলিক কাঠামো। অথচ আমেরিকা টিকে থাকলো? শুধু কি সমর শক্তি আর বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডের কারণেই আমেরিকা টিকে আছে?  আমার তো মনে হয় টিকে থাকার ‘যাদুর মূল সুত্র’ ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই’র ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে। প্রণিত মাত্র ৪টি নীতি যুক্তরাষ্ট্র ও তার জনগণের প্রাণ ভোমরা। তাঁরা শত প্রতিকুলতাতেও শতাব্দির পর শতাব্দি ৪ নীতির সংবিধানকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। জনগণকে প্রাধান্য দিয়েছেন, তাই তাঁরা অটুট ঐক্যে টিকেও আছেন। আপনি একমত নাও হতে পারেন। বাস্তবতা মানবেন কিনা সেটি একান্ত আপনার বিষয়।  আজকের দিনে আমেরিকা,বাংলাদেশ সহ পৃথিবীর দেশে দেশে স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী মানুষের প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য ----।  ৪ জুলাই, ২০২৫,