জি নেটওয়ার্কের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘জি ২৪ ঘণ্টা’কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের গভীর রাজনৈতিক সংকট নিয়ে কথা বলেছেন। সেখানে তিনি সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা, অর্থনীতিকে সচল করা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের পরিকল্পনা তুলে ধরেন।  প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ বাংলাদেশে চলমান সংকটের মধ্যে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, বন্দিদের মুক্তি, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং প্রতিষ্ঠানগুলো পুনর্গঠনের অঙ্গীকার করেছেন শেখ হাসিনা। 

সাক্ষাৎকারের মূল অংশ: প্রশ্ন: বাংলাদেশে ফেরার পর আপনার প্রথম অগ্রাধিকার কী হবে? শেখ হাসিনা: আমার প্রথম অগ্রাধিকার হবে সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থা এবং আইনের শাসন পুনরুদ্ধার করা। বাংলাদেশ গত কয়েক মাস ধরে চরম অরাজকতা, গণপিটুনি (মব ভায়োলেন্স), যথেচ্ছ আটক এবং আমাদের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পদ্ধতিগত ধ্বংসযজ্ঞের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।  বর্তমানে ১ লাখ ৫২ হাজারেরও বেশি মানুষ ভিত্তিহীন রাজনৈতিক মামলায় বন্দি রয়েছেন এবং তারা কারাগারে অমানবিক পরিস্থিতি ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এর বাইরে, ইউনুস (ড. মুহাম্মদ ইউনুস) যা ধ্বংস করেছেন, আমাদের তা পুনরায় গড়ে তুলতে হবে। আমাদের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি থমকে গেছে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তরুণ, কৃষক ও শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ হারিয়ে গেছে।

আমাদের প্রজাতন্ত্রের ধর্মনিরপেক্ষ ভিত্তি আক্রান্ত হয়েছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা প্রতিদিন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই; তার বদলে যা চলছে তা হলো ‘মব টেররিজম’ বা গণ-সন্ত্রাস। ইউনুস যাদের ক্ষমতায়ন করেছেন, সেই চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর হাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ নির্যাতিত হচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলোর অনেকের সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনের যোগসূত্র রয়েছে, যারা এখন বিচারহীনতা ভোগ করছে এবং নিজেদের করা নৃশংসতার কথা গর্বের সঙ্গে স্বীকার করছে। এই ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে, জনগণের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে এবং দেশকে আবারও অগ্রগতির পথে নিতে বাংলাদেশের এখন একটি গণতান্ত্রিক ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত (জনগণের ভোটে নির্বাচিত) সরকার প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ সরকারে বা বিরোধী দলে যেখানেই থাকুক, সেবা করতে প্রস্তুত। তবে দল নিষিদ্ধ এবং নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়ে সেটি সম্ভব নয়।

২ তারেক রহমান এবং বিএনপি কি বিশ্বাসযোগ্য? শেখ হাসিনা: বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সংসদীয় বিরোধী পক্ষ হিসেবে দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। আমরা যখন ক্ষমতায় ছিলাম, তারা আমাদের বিরোধিতা করেছে; যখন তারা ক্ষমতায় ছিল, আমরা তাদের বিরোধিতা করেছি। গণতন্ত্র এভাবেই চলে। একটি সুস্থ বিরোধী দল শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করে। তবে আমাদের তথ্যগুলো ভুলে গেলে চলবে না। তারেক রহমান জনস্বার্থের অর্থ আত্মসাতে সহায়তার জন্য দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর ১৭ বছর লন্ডনে আরামদায়ক নির্বাসনে কাটিয়েছেন। নেতৃত্বের জন্য জবাবদিহিতা এবং উপস্থিতির প্রয়োজন হয়, বিদেশ থেকে নির্দেশনা দেওয়া এবং পরিস্থিতি অনুকূল মনে হলে হঠাৎ ফিরে আসা নেতৃত্বের কাজ নয়। আমার কাছে আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ হাসিলের জন্য চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোর সাথে জোটবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে বিএনপির ধারাবাহিক প্রবণতা।

এখনই আমরা দেখছি, বিএনপির কর্মীরা ভোটারদের দোরগোড়ায় গিয়ে ভয় দেখাচ্ছে এবং সহিংসতা ও ধ্বংসলীলার ভয় দেখিয়ে ভোট দিতে বাধ্য করছে। এটি গণতন্ত্র নয়, এটি জবরদস্তি। যদি বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করে, তবে আমি তাদের প্রতি আহ্বান জানাব—আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে এবং আমাদের বৈধ বিরোধী দল হিসেবে কাজ করার সুযোগ দিয়ে যেন প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হয়। প্রকৃত বিরোধী দলহীন সংসদ কোনো সংসদই নয়।  সন্ত্রাসী ওসমান হাদীকে ‘শহীদ’ আখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং তাকে কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন? জাতীয় কবি এবং একজন সন্ত্রাসী পাশাপাশি শুয়ে আছেন— শেখ হাসিনা: এটি আমাদের জাতীয় মর্যাদা এবং ইতিহাসের ওপর একটি কলঙ্কজনক আঘাত। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আমাদের মুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সাম্যের প্রতীক। তার পাশে একজন সন্ত্রাসীকে স্থান দেওয়া কেবল কবিকেই অপমান করা নয়, বরং বাংলাদেশের চেতনাকে অপমান করা। এটি বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং চরমপন্থার প্রতি তাদের সমর্থনেরই বহিঃপ্রকাশ। যারা আমাদের ইতিহাসকে কলুষিত করছে, তারা দেশের ভবিষ্যৎকেও অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। কাজী নজরুল ইসলাম দাঁড়িয়েছিলেন নিপীড়নের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শোষিতের মর্যাদার পক্ষে। শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর যে সহিংসতা হয়েছে, তা এই আদর্শের সম্পূর্ণ বিপরীত।

এই সহিংসতার সাথে জড়িত প্রতিটি মৃত্যু একটি বড় ক্ষতি। কিন্তু যারা সহিংসতা ও ধ্বংসলীলায় অংশ নিয়েছে, তাদের মহিমান্বিত করাটা অত্যন্ত উদ্বেগের। ঢাকা-৮ আসনে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি প্রার্থীদের মধ্যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকেই শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু ঘটেছিল। একটি বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার বদলে কর্তৃপক্ষ উন্মত্ত জনতাকে (মব) সাংবাদিকদের ভেতরে রেখেই পত্রিকা অফিস পুড়িয়ে দেওয়ার এবং কূটনৈতিক মিশনে হামলা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছে। আমার কাছে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এই জনতা আমাদের সমাজের অন্যতম মৌলিক স্তম্ভ ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা’র ওপর আঘাত হেনে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। আমাদের শাসনামলে আমরা মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে উৎসাহিত করেছি। সাংবাদিকরা ভয়ভীতি বা প্রতিশোধের আশঙ্কা ছাড়াই স্বাধীনভাবে লিখতে পারতেন। একটি সুস্থ ও কার্যকর গণতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হিসেবে রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষকে স্বাগত জানানো হতো। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ পুড়িয়ে, মানুষ হত্যা করে এবং সারা দেশে আতঙ্ক সৃষ্টি করে ক্ষমতায় আসা একজন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান যখন এই ধরণের সহিংসতার জয়গান করেন, তখন আর অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। ৪. ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার শেষকৃত্যে যোগ দিয়েছিলেন।

বিএনপি এবং ভারতের সম্পর্ককে আপনি কীভাবে দেখছেন? শেখ হাসিনা: ভারতের এই পদক্ষেপ ছিল একজন সাবেক সরকার প্রধানের প্রতি কূটনৈতিক সৌজন্য ও সম্মান প্রদর্শন। রাজনৈতিক জীবনে খালেদা জিয়ার ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং দেশের জন্য তার অবদানও গুরুত্বপূর্ণ। আমি তার পরিবার এবং যারা তার জন্য শোকাহত, তাদের প্রতি সমবেদনা জানাই। তবে ভারতের মৌলিক স্বার্থগুলো অপরিবর্তিত রয়েছে। ভারত বাংলাদেশে একজন নির্ভরযোগ্য অংশীদার চায়: যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারে, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা দেয়, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা সমুন্নত রাখে। বর্তমান পরিস্থিতি—যেখানে চরমপন্থী মব ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর সন্ত্রাস চালাচ্ছে, সাংবাদিকদের হুমকি দিচ্ছে এবং কূটনৈতিক প্রাঙ্গণে হামলা করছে—তা কোনো দেশের জন্যই কল্যাণকর নয়। আমাদের দুই দেশের মধ্যকার বন্ধন অনেক গভীর, যা কয়েক দশকের সতর্ক সহযোগিতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের দেশ দুটির মধ্যে যে স্বাভাবিক অংশীদারিত্ব রয়েছে, তা একদিন আবারও পুনরুদ্ধার হবে। ৫. আপনি আপনার দলকে কীভাবে পুনর্গঠন করবেন এবং দলের ভেতরে নতুন প্রজন্মের ভূমিকা কী হবে? শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগ কখনো একটি একক পরিবারের ছিল না।

এটি কোটি কোটি বাংলাদেশির দল, যারা গণতন্ত্র, স্বাধীনতা এবং ১৯৭১-এর মূল্যবোধে বিশ্বাস করে। আমাদের দল স্বাধীনতার সংগ্রাম থেকে উঠে এসেছে এবং প্রতিটি গ্রাম ও পাড়ায় এর শিকড় ছড়িয়ে আছে। বর্তমান সংকট আমাদের দেখিয়েছে কোথায় কোথায় পরিবর্তন বা সংস্কার প্রয়োজন। আমাদের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা প্রতিটি প্রজন্মের সাথে সংযোগ রক্ষা করতে পারবে, যারা শহর ও গ্রামের তরুণদের চ্যালেঞ্জগুলো বুঝবে এবং আমাদের আদর্শ ঠিক রেখে ডিজিটাল যুগে নেতৃত্ব দেবে। নতুন নেতৃত্বের দাবি যৌক্তিক এবং আমরা তা শুনছি। আমাদের সরকারের অর্জনগুলো কখনোই কোনো একক ব্যক্তির ছিল না। এগুলো ছিল আমাদের দলের কর্মীদের এবং বাংলাদেশের মানুষের, যারা নয়বার আমাদের ওপর আস্থা রেখেছেন। সেই সম্মিলিত শক্তি এখনও অটুট। কোটি কোটি বাংলাদেশি এখনও আমাদের ওপর আস্থা রাখেন এবং আসন্ন নির্বাচনে আমাদের অংশ নিতে দেওয়া হলে তারা আবারও আমাদের ভোট দেবেন। কিন্তু অর্থবহ পুনর্গঠনের জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ প্রয়োজন। একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে রেখে, হাজার হাজার সমর্থককে বিনা বিচারে আটকে রেখে ও নির্যাতন করে এবং দলীয় সদস্য হওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে পুনর্গঠন সম্ভব নয়।

 গত এক বছর আপনি কীভাবে কাটিয়েছেন? আপনি কি নিয়মিত আপনার দলের সাথে যোগাযোগ রাখেন? আপনি কি মনে করেন এটি আপনাকে বাড়তি শক্তি দেয়? শেখ হাসিনা: আমরা যা কিছু গড়ে তুলেছিলাম—অর্থনৈতিক অগ্রগতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা—তা পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস হতে আমি দূর থেকে দেখেছি। আমাদের মানুষের কষ্ট, সমর্থকদের ওপর নির্যাতন এবং সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা দেখাটা অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক ছিল। কিন্তু আমি অসাধারণ সাহসও দেখেছি। প্রতিদিনের হয়রানি, কারাবরণ এবং নির্যাতন সহ্য করেও আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাদের আদর্শ ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছেন। সাংবাদিকরা তাদের স্বাধীনতার ওপর আঘাত সত্ত্বেও বর্তমান বাংলাদেশের বাস্তবতার সত্য তুলে ধরা চালিয়ে গেছেন। সাধারণ বাংলাদেশিরা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কথা বলার সাহস দেখিয়েছেন। আমাদের দল এবং মানুষের সাথে যুক্ত থাকাটা আমার জন্য অপরিহার্য ছিল। আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠন নয়; এটি ১৯৭১-এর চেতনা এবং একটি ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্নের প্রতিনিধিত্ব করে। ভয়ভীতি আর নির্যাতন দিয়ে সেই স্বপ্নকে মুছে ফেলা যাবে না। আমি ধৈর্য ধরে আছি কারণ আমি জানি, ভয় এবং বর্জনের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা শাসন ব্যবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশ তার জনগণের, এবং শেষ পর্যন্ত তারাই দেশটিকে ফিরে পাবে।

 ইংরেজি থেকে বাংলা: হুমায়ূন কবীর ঢালী