এম আব্দুর রাজ্জাক,বগুড়া থেকে :
“আমাকে নিয়ে যাতে আপনারা অহংকার করতে পারেন সেই দোয়া আপনারা করবেন,” বলেন তিনি। উত্তরের পথে দিনভর ভোটের সমাবেশের অংশ নেওয়ার পর রাতে বগুড়ায় নিজের নির্বাচনি এলাকায় পৌঁছে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, এতদিন বঞ্চিত বগুড়া ন্যায্য অধিকার অবশ্যই পাবে। তবে বগুড়ার নাম খারাপ করা যাবে না। আগামী নির্বাচনে বগুড়াবাসীর কাছে দোয়া ও সমর্থনও চান তিনি। ২৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার ) রাত ১১টার দিকে বগুড়ার আলতাফুন্নেসা মাঠে নির্বাচনি সমাবেশে বক্তব্য দেওয়া শুরু করেন বিএনপি চেয়ারম্যান।
নওগাঁ থেকে সন্ধ্যা ৭টার দিকে বিএনপি প্রধানের গাড়িবহর বগুড়ার উদ্দেশে রওনা হয়। তখন থেকেই পথে পথে নেতাকর্মীরা রাস্তার দুই ধারে সমবেত হয়ে তাকে স্বাগত জানাতে অপেক্ষায় ছিলেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। সেই কারণে তা ডিঙিয়ে সমাবেশস্থলে আসতে নির্ধারিত সময়ের চাইতে সাড়ে চার ঘণ্টারও বেশি সময়ে লেগে যায়। বগুড়া শহরের নিজের নির্বাচনি আসনের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে তারেক রহমান রাত পৌনে ১১টার দিকে আলফাতুন্নেসা খেলার মাঠে পৌঁছান। এসময়ে পুরো সমাবেশস্থল তাকে স্বাগত জানাতে শ্লোগানে সরব হয়ে ওঠে। তিনি মঞ্চে উঠে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানান। এই সময়ে মঞ্চে ছিলেন তার স্ত্রী জুবাইদা রহমানও। পরে সদ্য প্রয়াত বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়। নিজের নির্বাচনি এলাকায় বগুড়া-৬ এর এ সমাবেশে বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে নেতাকর্মীরা এসেছেন। কেউ কেউ বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এসেছে তাদের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় চালাতে। দেড় যুগ পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরার পর এই প্রথম বগুড়া আসলেন তারেক রহমান। নির্বাচনি প্রচারণা শুরুর আগে খালেদা জিয়ার এক শোকসভায় যোগ দিতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অনুরোধ বগুড়া সফর স্থগিত করেন তিনি।
আসন্ন নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন ছাড়াও ঢাকা-১৭ আসনে প্রার্থী হয়েছেন তারেক রহমান। রাতের এ জনসমাবেশে বগুড়া-১ আসনের কাজী রফিকুল ইসলাম, বগুড়া-২ আসনের মীর শাহে আলম, বগুড়া-৩ আসনের আবদুল মুহিত তালুকদার, বগুড়া-৪ আসনের মোশারফ হোসেন, বগুড়া-৫ আসনের প্রার্থী গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ এবং বগুড়া -৭ আসনের মোরশেদ মিলটনকে পরিচয় করিয়ে দেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তিনি বগুড়ায় নিজের জন্য এবং অন্যান্য আসনের প্রার্থীদের জন্য ধানের শীষে ভোট চান। তারেক রহমান বলেন, “আজ এই মুহূর্তে আমার আপনাদেরকে কিছু দেবার নাই। এই মুহূর্তে আপনাদের কাছে শুধু আমার চাইবার আছে। ঘরের মানুষ এই যে, আমি এত রাত্রে যে সভা করছি, এই যে রাজনীতি করছি, এ যে কাজ করছি আমার স্ত্রী যদি আমাকে সহযোগিতা না করতেন আমি কিন্তু পারতাম না। ওনার সহযোগিতা আছে বলেই আমি পেরেছি।
“ঠিক একইভাবে আপনারা বগুড়ার মানুষ যদি আমার পাশে থাকেন, আমাকে যদি মানসিকভাবে শক্তি সমর্থন আপনারা দেন তাহলে ইনশাআল্লাহ আমরা বাংলাদেশকে আগামী দিনে একটা সুন্দর ভালো শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারব।” তারেক রহমান বলেন, ‘‘আপনাদেরই আরেক সন্তান সবসময় বলতেন-তার নাম হচ্ছে শহীদ জিয়াউর রহমান উনি বলতেন, দেশকে গড়তে হলে আমাদের সকলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধভাবে আমাদেরকে কাজ করতে হবে। “আমরা কাজ না করলে আমাদের দেশকে আমরা গড়ে তুলতে পারব না। কাজেই ওনার কথার সাথে মিল রেখে আমি একটা কথা বলি, সবসময় প্রত্যেক জায়গায় বলেছি, সেই কথাটা হচ্ছে, করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ।”
তিনি বলেন, “আমাকে নিয়ে যাতে আপনারা অহংকার করতে পারেন সেই দোয়া আপনারা করবেন।” ‘বগুড়াকে বিতর্কিত করা যাবে না’ তারেক রহমান বলেন, “আল্লাহ চাইতো সরকার গঠন করলে শুধু নিজের এলাকার কথা চিন্তা করলে চলবে না। বগুড়াবাসীকে নিজের জেলার সাথে সাথে সমগ্র দেশের কথা চিন্তা করতে হবে। আপনাদেরকে সমগ্র দেশের নেতৃত্ব দিতে হবে। “আর চাকরি-বাকরি অথবা ব্যবসা-বাণিজ্য যেগুলা আছে ইনশাল্লাহ সবকিছু যোগ্যতার ভিত্তিতেই হবে। যেহেতু আমরা নিশ্চয়ই চাইবো না যে অন্য কেউ আমাদেরকে কোনো বিতর্কিত অবস্থান ফেলুক যে বগুড়া বলেই সব পাচ্ছে।“ ‘নিজের ঘরে এসে শুকরিয়া’ তারেক রহমান বলেন, ‘‘কেমন আছেন আপনারা সবাই? আমি প্রথমেই আজকে আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে চাই। কারণ, আজকে প্রায় ১৯ বছর পরে আল্লাহ আমাকে আবার তৌফিক দিয়েছেন এই, নিজের ভূমিতে ফিরে আসার। প্রিয় বগুড়াবাসী নিজের ঘরে এসে কী বলব? আসলে আমি নিজেও একটু তাল হারিয়ে ফেলেছি, নিজেও অনেকটা ইমোশনাল হয়ে গিয়েছি।
“আমি সেজন্য নির্বাচনি জনসভায় বক্তব্য রাখার কথা কিন্তু কি বক্তব্য আমি রাখবো ঠিক আমি নিজেও বুঝে উঠতে পারছি না। ঘরের মানুষের কাছে তো বলবার কিছু নেই। আছে কিছু ঘরের মানুষের কাছে বলবার?” ২০০১-২০০৫ সালে বগুড়ার জন্য বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করার কথা তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন,‘‘ নিশ্চয়ই আপনাদের মনে আছে যে বগুড়া সদরসহ সমগ্র জেলায় মানুষের প্রয়োজনে যেই কাজগুলো করা দরকার ছিল আমরা চেষ্টা করেছি সব কাজগুলো কম বেশি করার জন্য হয়তো আমরা ১০০% সাকসেসফুল হইনি। কিন্তু যতটুকু পেরেছি সরকারের আইন কানুন ও রীতিনীতির মধ্য থেকে যতটুকু সম্ভব হয়েছে আমরা চেষ্টা করেছি।
“এই বনানী মাটিডালি রাস্তায় বলুন, এই যে চওড়া রাস্তা বলুন, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ বলুন, গ্যাসের লাইনের কথা বলুন, এরকম আরো বিভিন্ন উন্নয়নের কাজের কথা বলুন না কেন যা যা মানুষের প্রয়োজন আমরা চেষ্টা করেছি। “এই বগুড়ার কাজগুলো করার জন্য বগুড়া আমার কাছে একটি মডেল জেলার মত ছিলো। কারণ আমি সবসময় চিন্তা করতাম যে বাংলাদেশের ৬৩টি জেলাকে কীভাবে কোনদিন যদি আল্লাহ সুযোগ দেয় কোনদিন যদি আল্লাহ রহমত দেয় তাহলে ওই ৬৩টি জেলা আছে বগুড়া মডেলের মতো সাজাব।” জেলা সভাপতি রেজাউল করীম বাদশার সভাপতিত্বে নির্বাচনি সমাবেশে বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য একেএম মাহবুবুর রহমান, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ভিপি সাইফুল ইসলাম, জেলার নেতারা বক্তব্য রাখেন। উত্তরাঞ্চল তিন দিনের সফরের দুপুরে তারেক রহমান ঢাকা থেকে বিমান যোগে রাজশাহী পৌঁছান। রাজশাহী মাদ্রাসা মাঠে এবং নওগাঁ এটিম মাঠে দুইটি নির্বাচনী জনসভা করে রাতে বগুড়ায় আসলেন তিনি।
