শাহ জে. চৌধুরী
প্রেম কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না, মানে না কোনো সুনির্দিষ্ট ভাষা। আদিম মানুষের গুহাচিত্র থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল যুগের খুদে বার্তা—সবখানেই প্রেম এক অনিবার্য উপস্থিতি। অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এ প্রকাশিত হুমায়ূন কবীর ঢালীর সম্পাদিত 'বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা' সংকলনটি সেই শাশ্বত অনুভূতিরই এক বিশাল ক্যানভাস। ৩৭০-এর অধিক পৃষ্ঠার এই গ্রন্থে সম্পাদক বিশ্বসাহিত্যের ধ্রুপদী প্রেমের পঙ্ক্তিমালাকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। সংকলনের কাঠামো ও বিষয়বৈচিত্র্য: বইটির সূচিপত্র দেখে বোঝা যায় এর ব্যাপ্তি কতটা বিশাল।
একে মূলত তিনটি প্রধান স্তম্ভে ভাগ করা যায়: বাংলা কবিতার ধ্রুপদী ধারা (Classics): রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘অনন্ত প্রেম’ বা ‘প্রথম চুম্বন’ দিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রায় পাঠক খুঁজে পাবেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘বুনো পিয়াসি’ বা ‘নদী পারের মেয়ে’র সেই বিদ্রোহী প্রেমকে। জীবনানন্দ দাশের নির্জনতা, জসীম উদ্দীনের পল্লী-আবেগের ছোঁয়া, কিংবা শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদের নাগরিক ও গ্রামীণ প্রেমের দ্বৈরথ—সবই এখানে পরম যত্নে স্থান পেয়েছে। বিশেষ করে শক্তি চট্টোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় প্রেমের যে বিচিত্র রূপ (দ্রোহ ও সমর্পণ), তা এই সংকলনটিকে সমৃদ্ধ করেছে। বিশ্বসাহিত্যের অমর পঙ্ক্তিমালা (World Classics): ইংরেজি সাহিত্যের শেক্সপিয়র থেকে শুরু করে জন ডান, লর্ড বাইরন, জন কিটস এবং এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিংয়ের কবিতাগুলো এখানে সংকলিত হয়েছে।
এছাড়া পাবলো নেরুদার সেই বিখ্যাত ‘সনেট XLIX’ এবং মায়া অ্যাঞ্জেলোর কবিতাগুলো বিশ্বজনীন প্রেমের আবেশ তৈরি করে। অনুবাদের ক্ষেত্রে সম্পাদক মূল সুরটি বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন, যা সাধারণ পাঠকের কাছে বিশ্বসাহিত্যের দুয়ার খুলে দেবে। সমকালীন বাংলাদেশ ও বিশ্বের মেলবন্ধন: এই সংকলনের সবচেয়ে সাহসী ও আধুনিক দিক হলো সমকালীন কবিদের অন্তর্ভুক্তি। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সময়ের কবিদের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের (যেমন: মন্টিনিগ্রো, কলোম্বিয়া, আলবেনিয়া, উজবেকিস্তান, ফিলিপাইন) কবিদের কবিতা এখানে স্থান পেয়েছে। বর্তমান প্রজন্মের প্রেমে যে একাকীত্ব, প্রযুক্তির ছোঁয়া এবং অস্তিত্বের সংকট কাজ করে, তা এই অংশটি পাঠ করলে স্পষ্ট হয়। সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি—সাহস ও সততা: একজন শিশুসাহিত্যিক হিসেবে হুমায়ূন কবীর ঢালী খ্যাতিমান ।
পাশাপাশি তিনি সৃজনশীলতার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছেন। ইদানিং তিনি কবিতা চর্চায় মনোনিবেশ করছেন এবং নিয়মিত কবিতা লিখছেন । সংকলনে অন্তর্ভুক্ত ভূমিকাটি পড়লে তার কাব্যিক জ্ঞান ও দক্ষতা সম্পর্কে পাঠক জানতে পারবেন । তিনি ভূমিকায় অত্যন্ত বিনয়ের সাথে স্বীকার করেছেন যে, এই সংকলনটি করতে গিয়ে তাকে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে। গত চার বছর ধরে তিনি এই কবিতাগুলো সংগ্রহ করেছেন। তার সম্পাদনার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি কেবল প্রতিষ্ঠিত কবিদের নাম দেখে কবিতা নেননি, বরং কবিতার অন্তর্নিহিত শক্তিকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সম্পাদক নিজেই উল্লেখ করেছেন, কিছু ক্ষেত্রে বয়োজ্যেষ্ঠ ও কনিষ্ঠ কবিদের ক্রম সাজানোর ক্ষেত্রে যান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা থাকলেও, কবিতার ‘আবেদন’ বিচারে তিনি আপস করেননি। ফেসবুক বা আধুনিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে তিনি যেভাবে বিশ্বব্যাপী কবিদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করেছেন, তা বর্তমান সময়ের এক অনন্য উদাহরণ।
কারিগরি ও নান্দনিক দিক: গুলশান কবীরের প্রচ্ছদে বইটির অবয়ব যেমন আকর্ষণীয়, তেমনি ভেতরের মুদ্রণ পরিপাটি। ৭০০ টাকা মূল্যের এই সংকলনটি কেবল একটি বই নয়, বরং এটি একটি দীর্ঘকালীন রেফারেন্স গ্রন্থ। বিদেশের পরিবেশক হিসেবে নিউইয়র্কের মুক্তধারা এবং কলকাতার এআইবি বা বইবাংলা-র নাম থাকা নির্দেশ করে যে, এর পাঠক কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়। সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা: যেকোনো সংকলনেই কিছু না কিছু বাদ পড়ে যাওয়ার আক্ষেপ থাকে। সম্পাদক নিজেও সেই আক্ষেপের কথা জানিয়েছেন। অনেক খ্যাতিমান কবির কবিতা সংগ্রহ করতে না পারা বা নতুনদের জয়জয়কারের ভিড়ে কিছু ধ্রুপদী নাম হারিয়ে যাওয়া—একজন সচেতন পাঠকের চোখে পড়তে পারে। তবে সূচিপত্রের বিন্যাসে যে শ্রম দেখা গেছে, তা সেই ছোটখাটো ত্রুটিকে অনায়াসেই ঢেকে দেয়।
উপসংহার: 'বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা' সংকলনটি প্রেমের এক বৈশ্বিক মহাকাব্য। যারা প্রেমের কবিতায় জীবনের মানে খোঁজেন, যারা বিরহ আর মিলনের সন্ধিক্ষণে শব্দকে সঙ্গী করতে চান, তাদের জন্য এই গ্রন্থটি হতে পারে এক পরম উপহার। অমর একুশে বইমেলা ২০২৬-এর অন্যতম সেরা প্রাপ্তি হিসেবে এই সংকলনটি গণ্য হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই। বইয়ের নাম : বাংলাদেশ ও বিশ্বের প্রেমের কবিতা সম্পাদনা: হুমায়ূন কবীর ঢালী প্রকাশক: গুলশান আরা বাবলি, অন্বয় প্রকাশ প্রকাশকাল: একুশে বইমেলা ২০২৬ মূল্য: ৭০০ টাকা ($ ৩৫.০০)
