আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলা ও মহীশূরের ভূমিকা

মোস্তফা সারওয়ার

আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কথা উঠলেই আমাদের কল্পনায় ভেসে ওঠে লেক্সিংটন ও কনকর্ডের ধুলোভরা পথ। ফিলাডেলফিয়ার সভাকক্ষের উত্তপ্ত বিতর্ক। আর স্বাধীনতার জন্য এক জাতির জেগে ওঠা। আমরা একে সাধারণত ব্রিটিশ অত্যাচারের বিরুদ্ধে এক স্থানীয় বিদ্রোহ হিসেবেই দেখি। অথচ ইতিহাসের গভীর স্রোতধারা বলছে ভিন্নতর কাহিনী। এই রাষ্ট্রের জন্মরেখা ভারতীয় উপমহাদেশের মাটিতেও টেনে রাখা ছিল। আধুনিক জাতীয় পরিচয় তখনও গড়ে ওঠেনি। দূরত্ব ছিল দুর্লঙ্ঘ্য। তাই আমেরিকার মাটিতে কোনো বাঙালি বা ভারতীয় যোদ্ধার উপস্থিতির প্রত্যক্ষ নথি নেই। কিন্তু অর্থনীতি, সামরিক কৌশল, আর সাম্রাজ্যবাদী রাজনীতির অদৃশ্য সুতোয় ভারত ও আমেরিকা তখনই বাঁধা পড়ে গিয়েছিল।

বাংলার আগুন: দুর্নীতি, চা, আর বিপ্লবের জন্মপলাশীর যুদ্ধের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার সম্পদশালী ভূখণ্ড দখল করে নেয়। কিন্তু দুর্নীতি, লোভ, আর ১৭৭০ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে কোম্পানি প্রায় ধ্বংসের মুখে পড়ে। এই ডুবন্ত জাহাজকে বাঁচাতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৭৭৩ সালের চা আইন পাস করে। যার ফলে ইস্ট ইন্ডিয়া  কোম্পানি আমেরিকায় শুল্কমুক্ত চা বাজারজাত করে মুনাফা লুটতে পারে। এটা ছিল স্থানীয় ব্যবসায়ীদের নিঃস্ব করার নিদারুন কৌশল। বৃটিশ বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদিদের এই একচেটিয়া লোভই আমেরিকানদের ক্ষোভে আগুন ধরায়। জন্ম দেয় বোস্টন টি পার্টির। যেন বাংলার শোষণের ধোঁয়া উড়ে গিয়ে আমেরিকার আকাশে বিদ্রোহের  মেঘ জমিয়ে তোলে।

যুদ্ধ শেষে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট হয়। ইয়র্কটাউনে ওয়াশিংটনের কাছে আত্মসমর্পণ করা জেনারেল কর্নওয়ালিসকে কয়েক বছরের মধ্যেই পাঠানো হয় বাংলায়। যেখানে তিনি চিরস্থায়ী  বন্দোবস্তের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের শেকড় আরও গভীরে পুঁতে দেন। পশ্চিমে পরাজিত সাম্রাজ্যের ধ্বংসাবশেষ থেকে তিনি পূর্বে উঠতে থাকা সাম্রাজ্যের দিকে মুখ ফেরান।

দক্ষিণের বজ্রধ্বনি: হায়দর আলি ও টিপু সুলতান

১৭৭৮ সালে ফ্রান্স আমেরিকার মিত্র হয়ে যুদ্ধে নামতেই সংঘাতটি বিশ্বযুদ্ধে রূপ নেয়। ব্রিটিশ শক্তিকে ভাঙতে ফ্রান্স হাত বাড়ায় দক্ষিণ ভারতের মহীশূরের দিকে। হায়দর আলি ও তাঁর অগ্নিমেধা পুত্র টিপু সুলতানের দিকে।

ফরাসিদের সঙ্গে জোট বেঁধে তারা দ্বিতীয় মহীশূর যুদ্ধ শুরু করেন। পলিলুরের যুদ্ধে তাদের লোহার খাপে মোড়া রকেট আকাশে আগুনের রেখা এঁকে ব্রিটিশ বাহিনীকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই প্রতিরোধ ব্রিটেনকে বাধ্য করে তার নৌবাহিনীর এক-পঞ্চমাংশ, হাজারো সৈন্য, আর বিপুল অর্থ ভারতমুখী করতে। ফলে আমেরিকার যুদ্ধক্ষেত্রে সেনাপতি জর্জ ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে তাদের শক্তি ভেঙে পড়ে।

আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতাদের অনুপ্রেরণা

জন অ্যাডামস কংগ্রেসে চিঠি লিখে “বিখ্যাত হায়দর আলি”-র প্রশংসা করেন। চিঠিটি কংগ্রেসে পাঠও করা হয়।

প্যারিসে বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের কাছে ফরাসি কর্মকর্তারা আমেরিকানদের সঙ্গে হায়দর আলির সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দেন। টিপু সুলতানও বৈশ্বিক বিপ্লবী আদর্শে মুগ্ধ ছিলেন।  তিনি জ্যাকোবিন ক্লাবে যোগ দেন। সেরিঙ্গাপাটমে (বর্তমানের  শ্রীরঙ্গপত্তন)  ‘স্বাধীনতার বৃক্ষ’ রোপণ করেন।

আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের শেষভাগে, মহীশূরের শাসক হায়দর আলি এবং তাঁর পুত্র টিপু সুলতান ছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম প্রধান  ও শক্তিশালী শত্রু। দূরপ্রাচ্যে ব্রিটিশ বাহিনীকে ব্যস্ত রেখে তাঁরা পরোক্ষভাবে আমেরিকার স্বাধীনতাকামীদের সাহায্য করছিলেন। হায়দর আলির এই ব্রিটিশ-বিরোধী বীরত্বে অনুপ্রাণিত হয়ে আমেরিকার পেনসিলভানিয়ার রাজ্য নৌবাহিনী তাদের একটি যুদ্ধজাহাজের নাম তাঁর সম্মানে "হায়দর আলি" (Hyder Ally) রাখে।

জাহাজটি ছিল মূলত একটি রাজ্য-পৃষ্ঠপোষকতায় চালিত বেসরকারি যুদ্ধজাহাজ। পেনসিলভানিয়ার বণিকদের সুরক্ষায় এবং ব্রিটিশ ব্লকেড ভাঙার জন্য জাহাজটি নিয়োজিত ছিল। এর কামান সংখ্যা ছিল ১৬টি। এর কমান্ডিং অফিসার ছিলেন মার্কিন নৌবাহিনীর অন্যতম কিংবদন্তি ক্যাপ্টেন জশুয়া বার্নি।

১৭৮২ সালের ৮ এপ্রিল, দেলাওয়ার উপসাগরের মোহনায় মার্কিন জাহাজ 'হায়দর আলি'র সাথে ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির যুদ্ধজাহাজ ‘এইচএমএস জেনারেল মঙ্ক’ (যার কামান সংখ্যা ছিল ২০টি) এর মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

ক্যাপ্টেন জশুয়া বার্নি অত্যন্ত চতুরতার সাথে একটি ভুল সিগন্যাল বা নির্দেশ মুখে উচ্চারণ করেন, যা ব্রিটিশ ক্যাপ্টেন শুনে বিভ্রান্ত হন। কিন্তু বার্নির নাবিকরা  আগে থেকেই আসল পরিকল্পনা জানত। এই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে 'হায়দর আলি' ব্রিটিশ জাহাজটিকে ধাক্কা দেয়। ফলে তাদের কামানগুলো অকেজো হয়ে পড়ে। মাত্র আধ ঘণ্টার অত্যন্ত তীব্র ও রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর, ব্রিটিশ জাহাজ ''এইচএমএস জেনারেল মঙ্ক মার্কিন জাহাজ 'হায়দর আলি'র কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

এই জয়টিকে আমেরিকান স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম সেরা এবং নিখুঁত নৌ-কৌশলগত বিজয় হিসেবে গণ্য করা হয়। পরবর্তীতে 'এইচএমএস জেনারেল মঙ্ক' জাহাজটির নাম বদলে 'জেনারেল ওয়াশিংটন' রাখা হয়েছিল।

আমেরিকার মাটিতে ভারতীয়দের ক্ষীণ পদচিহ্ন

ব্রিটিশ সামুদ্রিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে আঠারো শতকের শেষভাগে অল্পসংখ্যক ভারতীয় আমেরিকায় পৌঁছেছিলেন। নথিতে তারা “ইস্ট ইন্ডিয়ান” বা “লাস্কার” নামে পরিচিত। তাদের মধ্যে পিটার মেয়ার নামে এক নাবিক আমেরিকান জাহাজে কাজ করে ব্রিটিশ বাণিজ্যকে ব্যাহত করার কাজে অংশ নেন। পিটার মেয়ার নামটি ছিল পরিবর্তিত নাম।

এক জাতির স্বাধীনতা, আরেক জাতির পতন

ভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্রিটিশদের ব্যস্ততা আমেরিকার স্বাধীনতাকে সহজ করে তোলে। ১৭৮৩ সালের প্যারিস চুক্তিতে তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু মহীশূরের জন্য এর ফল ছিল ভয়াবহ। আমেরিকার তেরো উপনিবেশ হারিয়ে ব্রিটেন পূর্বে তার সাম্রাজ্য বিস্তারে আরও উন্মত্ত হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণের পর ১৭৯৯ সালে সেরিঙ্গাপাটম পতন হয়। টিপু সুলতান যুদ্ধক্ষেত্রে প্রাণ দেন। সিপাহী বিদ্রোহের পর তাঁর পরিবারবর্গকে মহিশূর থেকে কলিকাতা (বর্তমানের কোলকাতা)-য় নির্বাসিত করা হয়।

সমুদ্রের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা দুই জাতির ভাগ্য যেন একই ইতিহাসের দুই পৃষ্ঠা। একদিকে  স্বাধীনতার উত্থান। অন্যদিকে সাম্রাজ্যের নির্মম ছায়ায় এক রাজ্যের পতন।