আকবর হায়দার কিরন
বাংলাদেশের রাজনীতি আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাম্প্রতিক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর সম্ভাব্য দেশে প্রত্যাবর্তনের কথা বলেছেন। একই সঙ্গে বক্তব্য রেখেছেন সজীব ওয়াজেদও। রাজনৈতিক সমর্থক, সমালোচক এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক—সবার কাছেই এটি ছিল এক তাৎপর্যপূর্ণ বার্তা। এই সংবাদ সম্মেলনে নিউ ইয়র্ক থেকে একমাত্র সাংবাদিক হিসেবে সরাসরি যোগ দিয়েছিলেন আমার অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সুলতানা রহমান পুতুল। আর তাঁর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগ ঘরানার আমেরিকান-বাংলাদেশী কৃষিবিদ ড. প্রদীপ কর। তবে প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকতার আলোকেও একটি সংবাদ সম্মেলনের চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ এই পুরো অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখল? আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। আমার একমাত্র পক্ষ—বাংলাদেশ। কারণ সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু দেশ থেকে যায়। ইতিহাস থেকে যায়। মানুষ থেকে যায়।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের উন্নয়নকে অস্বীকার করা কঠিন। অবকাঠামো, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, ডিজিটাল প্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা—অনেক ক্ষেত্রে দেশ দৃশ্যমানভাবে এগিয়েছে। এসব অর্জন বাংলাদেশের ইতিহাসের অংশ হয়েই থাকবে। কিন্তু উন্নয়ন কখনোই একটি রাষ্ট্রের একমাত্র পরিচয় হতে পারে না। উন্নয়নের পাশাপাশি সমানভাবে প্রয়োজন গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নাগরিকদের সঙ্গে রাষ্ট্রের বিশ্বাসের সম্পর্ক। রাষ্ট্র তখনই ভেতর থেকে শক্তিশালী হয়, যখন একজন সাধারণ মানুষও মনে করে—তাঁর কণ্ঠস্বর শোনা হচ্ছে। ইতিহাসের কঠিন সময়গুলো আমাদের একটি চিরন্তন শিক্ষা দেয়—কখনও কখনও একটি আন্তরিক সংলাপ, একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত কিংবা মানুষের ক্ষোভকে গুরুত্ব দিয়ে নেওয়া পদক্ষেপে একটি জাতিকে বড় সংকট থেকে রক্ষা করা যায়। সেই সংকটময় মুহূর্তে যদি ছাত্রসমাজের সঙ্গে আরও খোলামেলা আলোচনা হতো, যদি বাস্তবতা আরও দ্রুত উপলব্ধি করা যেত, আর যদি চারপাশে এমন উপদেষ্টারা থাকতেন যারা ক্ষমতার ভাষার বদলে মানুষের ভাষা বুঝতেন—তাহলে হয়তো আজকের ইতিহাস অন্য রকম হতে পারত।
কোনো নিশ্চিত দাবি নয়; বরং ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার একটি সচেতন চিন্তা। ক্ষমতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা হলো—সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সত্য কথা বলার মানুষ কমে যায়। একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ কেবল অনুগত সমর্থক নন; বরং এমন মানুষ, যারা প্রয়োজনে ভিন্নমত প্রকাশ করার সাহস রাখেন। সৎ, দক্ষ এবং নীতিবান সহকর্মীরাই যে কোনো নেতৃত্বকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ও গ্রহণযোগ্য করে তোলেন। আরেকটি মৌলিক বিষয় আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব। তাঁর ঐতিহাসিক নেতৃত্বেই আমরা স্বাধীন রাষ্ট্র, লাল-সবুজের পতাকা এবং বিশ্ব মানচিত্রে এক স্বতন্ত্র পরিচয় পেয়েছি। তাঁর অবদান কোনো ক্ষণস্থায়ী রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় নয়; এটি আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় অংশ। ঠিক তেমনই, “জয় বাংলা” কেবল একটি নির্দিষ্ট দলের স্লোগান নয়; এটি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা, সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগ এবং স্বাধীনতার অমোঘ আহ্বান। এই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের।
আজকের এই জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, বরং পুনর্মিলনের রাজনীতি; ঘৃণার ভাষা নয়, শ্রদ্ধার ভাষা; বিভাজন নয়, পারস্পরিক সংলাপ। ইতিহাসকে যথাযথ সম্মান জানিয়ে, অতীত ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এবং নতুন প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বশীল হয়ে একটি মানবিক, গণতান্ত্রিক ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হওয়া উচিত আমাদের সর্বজনীন লক্ষ্য। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দলের জয়-পরাজয়ই ইতিহাসের শেষ কথা নয়। ইতিহাসের শেষ কথা—বাংলাদেশ। বাংলাদেশ তখনই সত্যিকার অর্থে জয়ী হবে, যখন স্বাধীনতার চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সমতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ একসূত্রে বিকশিত হবে। একটি দেশকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর উপায় হলো—তার অর্জনকে স্বীকার করা, তার ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং তার ভবিষ্যৎকে নতুন সাহসে গড়ে তোলা।
