আমার মাসিক শুরু হয়েছিল ১৯৭৯ সালে।  সেই সময়ের পরিবেশ, সেই সময়ের মানুষের চেতনা-সবকিছু আজকের থেকে একেবারেই ভিন্ন।  তখন পিরিয়ড মানেই লজ্জা, গোপনীয়তা, আর চুপচাপ নিজের মতো করে সামলে নেওয়া।  নিরাপদ সামগ্রী তো দূরের কথা-জ্ঞান, সচেতনতাও ছিল সীমিত।  আম্মাজিই আমাকে প্রথমে শেখালো কীভাবে পুরনো কাপড় ব্যবহার করতে হয়।  তিনি পরম যত্নে কাপড় গুছিয়ে দিতেন, কিন্তু আমি প্রথম প্রথম তা ব্যবহার করতেই পারতাম না ঠিকমতো।  একটার পর একটা কাপড় নষ্ট হয়ে যেত,  কখনো আব্বাজির লুঙ্গি, কখনো আম্মাজির পুরনো শাড়ি।  ব্যবহার শেষে কাপড় কীভাবে ধুতে হয়,  কোথায় শুকাতে হয়-এসব আমি শিখতাম ভুল করতে করতে।  লজ্জা আর ভয়ে ব্যবহারের পর কাপড় বাথরুমেই ফেলে রেখে আসতাম,কখনো বাথরুমের পাশে প্রাচীরের পিছনে লুকিয়ে রাখতাম।  এভাবে কত দিন চলেছে, তার হিসাব নেই।

 আজ বুঝি-  আমার ভুল ছিল না,আমার অজ্ঞতা ছিল না,  আমাদের সময়টাই ছিল এমন, যেখানে মেয়েরা নিজেদের ব্যথা, ভয় আর বিভ্রান্তি একা একাই লুকিয়ে নিয়ে চলত।  আমার বান্ধবীর নীরবতার বাক্স-যা আজও আমাকে ব্যথা দেয়।   আমার নিজের যন্ত্রণার সঙ্গে আরেকটি স্মৃতি জড়িয়ে আছে্য  আমার প্রিয় বান্ধবীর গল্প।  তার প্রথম পিরিয়ড শুরু হয়েছিল আরও কঠিন বাস্তবতার ভেতর।  বাড়িতে বড় বোনেরা থাকলেও সে কাউকে কিছু বলার সাহস পায়নি।  এক অদ্ভুত লজ্জা তাকে গ্রাস করে রেখেছিল।  সে ভাবত-কথা বলে ফেললে বুঝি অপরাধ করে ফেলবে।  তার যন্ত্রণা আরও গভীর ছিল-সে ব্যবহার করা কাপড় কোথায় রাখবে জানত না।  পরিষ্কার করার সুযোগও ছিল না।  অবশেষে সে একটি ফাঁদে আটকে গেল-ব্যবহৃত কাপড়গুলো জুতার বাক্সে লুকিয়ে রাখত,  আর মাসের পর মাস সেগুলোই আবার ব্যবহার করতো।  ভাবলে আজও বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে।  

একটা ছোট মেয়ে কতটা ভয়, কতটা লজ্জা আর কতটা নিঃসঙ্গতা বয়ে নিয়ে চললে এমনটা করতে বাধ্য হয়?  ধীরে ধীরে তার পড়াশোনার ফল খারাপ হতে লাগল। যে মেয়েটি ভীষণ মেধাবী ছিল,  পিরিয়ডের অস্বস্তি, ব্যথা আর গোপন দুঃসহ বাস্তব তাকে ভিতর থেকে দুর্বল করে দিচ্ছিল।  কেউ জানত না কেন তার এই পরিবর্তন।   শুধু আমি বুঝতে পারলাম, একদিন যখন সে হঠাৎ আমার কাছে মন খুলে দিল।  আমি তার পাশে দাঁড়ালাম-এক বন্ধুর মতো, এক বোনের মতো। আমি নিজে যেমন ভুল করতে করতে শিখেছি,তেমনই তাকে বুঝিয়ে বললাম-  কাপড় কেমন হতে হবে,কেমনভাবে ধুতে হবে,  কীভাবে পরিষ্কার রাখতে হবে।  সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-আমি তাকে বোঝালাম যে পিরিয়ড লুকানোর বিষয় নয়। এটা অপরাধ নয়, লজ্জার কিছু নয়।এটা জীবন।

 এটা আমাদের শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।  তার চোখে তখন আমি প্রথমবার দেখেছিলাম স্বস্তি।মনে হয়েছিল যেন কেউ তার দীর্ঘ নীরবতার ভার কাঁধ থেকে নামিয়ে দিয়েছে।আমার এবং তার অভিজ্ঞতা আমাকে সত্যিকারের বদলে দিয়েছে।   আমার কাপড় নষ্ট হওয়ার দিনগুলো,  বাথরুমে কাপড় লুকিয়ে রাখার লজ্জা,  আমার বান্ধবীর জুতার বাক্সে জমে থাকা ব্যথা-  এই দুই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে।   পিরিয়ড নিয়ে নীরবতা নয়,কথা বলা দরকার।  কারণ নীরবতা যত বাড়ে,অজ্ঞতা তত গভীর হয়,  আর অজ্ঞতা যত গভীর হয়,মেয়েরা তত একা হয়ে পড়ে। আমরা আজ যেটুকু সচেতন,যেটুকু সাহসী,যেটুকু স্বাচ্ছন্দ্যে কথা বলি- এসবই গড়ে উঠেছে সেই কঠিন দিনগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে।  আমি আজও মনে করি-যদি আমি না শেখাতাম আমার বান্ধবীকে শেখাতে পারতাম না। যদি আম্মাজি আমাকে  না শেখাতো তাহলে আমাদের শরীরের এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হয়তো আজও ছায়ার মতো লুকিয়ে থাকত।

  আমার দুটি মেয়ের ব্যাপারে আমি যথেষ্ট আন্তরিক ছিলাম। তাদেরকে বিষয়গুলো আমি খুব স্বাভাবিকভাবে বুঝিয়েছিলাম- মাসিকে কোন ভয় নয়, এটা একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। পৃথিবীর সব নারীর ক্ষেত্রে একই পদ্ধতি। তাই ভয় নয়, লজ্জা নয়। তারা এখন অন্যদেরকে স্বাস্থ্য সচেতন করে এবং সাহস জুগিয়ে থাকে।    পিরিয়ড লজ্জা নয়- পিরিয়ড শক্তির শুরু।  যে মেয়েরা একসময় চুপ করে সহ্য করত,  আজ তারা কথা বলে,জ্ঞান দেয়,আর পরের প্রজন্মকে নিরাপদ পথ দেখায়।  আমার অভিজ্ঞতা,আমার বান্ধবীর বেদনা,  আমার সময়ের সংগ্রাম,বর্তমানে আমার মেয়েদের বিজয় সবকিছু মিলেই আমাকে আজ এই সত্য শেখায়-  মেয়েদের জন্য নিরাপদ, পরিষ্কার, সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা শুধু প্রয়োজন নয়-এটা আমাদের দায়িত্ব।  

নন্দিনী লুইজা   কবি লেখক কলামিস্ট প্রকাশক ও সমাজকর্মী