এম আব্দুর রাজ্জাক,বগুড়া থেকে :
নওগাঁ জেলায় অবস্থিত রক্তদহ দেশের অন্যতম বৃহৎ বিল। অত্যন্ত নয়নাভিরাম এই বিলের নাম রক্তদহ হওয়ার পেছনে রয়েছে এক নির্মম ইতিহাস। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে বাংলায় একক মুসলিম শাসনের অবসান হয়। তখন এই দেশে ছড়িয়ে পড়ে নিপীড়নমূলক সামন্তবাদী শাসন। ব্রিটিশ বেনিয়াদের সহযোগিতায় দেশীয় রাজা ও জমিদাররা চেপে বসে জনসাধারণের ওপর। তাদের অত্যাচার ও নিপীড়নের মাত্রা সীমা অতিক্রম করলে এই দেশের ভূমিপুত্র দরিদ্র মুসলিম কৃষকরা বিদ্রোহ করে। বৃহত্তর রংপুর, দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ অঞ্চলের এমন একটি বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন ফকির মজনু শাহ, যা ইতিহাসে ফকির বিদ্রোহ নামে খ্যাত।
রক্তদহ বিল সেই আন্দোলনেরই স্মৃতি ও সাক্ষ্য বুকে ধারণ করে আছে। ফকির মজনু শাহ ছিলেন মাদারিয়া তরিকার একজন সুফি এবং উপমহাদেশের আজাদি আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার। বিহারের শাহ মাদার দরগার পীর শাহ সুলতান হাসান সুরিয়া বুরহানা (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তিনি এই তরিকার নেতৃত্ব লাভ করেন। পলাশীর পরাজয়ের পর যখন ব্রিটিশ বেনিয়া ও তাদের দেশীয় দোসররা এই দেশের মানুষকে চরম মাত্রায় শোষণ শুরু করে, তখন তিনি জনগণের মুক্তিসংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পলাশীর মাত্র ছয় বছর পর তিনি তাঁর সংগ্রাম শুরু করেন। ১৭৮৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত ফকির মজনু শাহ প্রায় ২৬ বছর নিজের সংগ্রাম চালিয়ে যান। তিনি ও তাঁর বাহিনী ব্রিটিশ বাহিনী ও স্থানীয় অত্যাচারী রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে অসংখ্য প্রকাশ্য ও গেরিলা যুদ্ধ পরিচালনা করে।
তারা সফলভাবে শত্রুর মনে আতঙ্ক এবং প্রজাসাধারণের মনে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগ্রত করেছিল। মজনু শাহর বাহিনীতে প্রায় ৫০ হাজার যোদ্ধা যোগ দিয়েছিল। তাদের মধ্যে অনেক সন্ন্যাসীও ছিলেন। মজনু শাহর ভয়ে কড়ই জমিদার শ্রীকৃষ্ণ চৌধুরী পালিয়ে ময়মনসিংহে আশ্রয় নেন। মজনু শাহ জমিদারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালনা করে এবং তাদের থেকে মুক্তিপণ আদায় করে যে অর্থ পেতেন তা দরিদ্র, অসহায় ও নিম্নবর্ণের মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিতেন। ফকির মজনু শাহর প্রধান ঘাঁটি ছিল বগুড়ার মহাস্থানগড়ে। এখান থেকেই তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতেন। তাঁর হাত থেকে বাঁচতে অত্যাচারী সামন্ত রাজা ও জমিদাররা ইংরেজ প্রভুদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে। ব্রিটিশ সরকার সেনানায়ক লেফটেন্যান্ট আইনস্টাইনের নেতৃত্বে একটি বড় বাহিনী পাঠায়। সংবাদ পেয়ে মজনু শাহ বিল ভোমরার কড়ই জঙ্গলে তাঁর বাহিনীকে সমবেত করেন।
ইংরেজ বাহিনী নৌকাযোগে কড়ই জঙ্গলের দিকে এগিয়ে আসতে থাকে এবং জঙ্গল ঘেরাও করার পরিকল্পনা করে। বিল ভোমরায় উভয় বাহিনীর রক্তক্ষয়ী সংঘাত হয়। যুদ্ধে উভয় পক্ষের বহু সেনা হতাহত হয়। যুদ্ধের পর ফকির বাহিনীর আহত সৈনিকদের ধরে ইংরেজ বাহিনী নির্বিচারে শহীদ করে দেয়। কথিত আছে, শহীদ ও নিহতদের রক্তে বিল ভোমরার পানি রক্তবর্ণ ধারণ করে এবং তখন থেকে এই বিলের নাম হয় রক্তদহ বিল। অবশ্য জমিদাররা ব্যঙ্গ করে এই বিলের নাম দিয়েছিল ফকির কাটার বিল। যুদ্ধে মজনু শাহর একজন শীর্ষ সহযোগী শহীদ হন। তাঁকে বিলের মধ্যে একটি উঁচু স্থানে দাফন করা হয়। তাঁর কবরটি এখনো সংরক্ষিত আছে। স্থানীয়দের কাছে কবরটি রক্তদহ দরগা নামে পরিচিত। কবরের পাশে শতবর্ষী একটি বটগাছও আছে। উল্লেখ্য, রক্তদহ বিল বগুড়া শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে আদমদীঘি উপজেলার সান্তাহার ইউনিয়ন, নওগাঁর রানীনগরের পারইল এবং আত্রাই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় অবস্থিত। প্রায় ৯০০ একর এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই বিলে ১৩টি খাল ও অন্যান্য জলপথ রয়েছে। রক্তদহ বিল সংলগ্ন জেলাগুলোর মাছ ও ধানের অন্যতম উৎস। বর্ষা মৌসুমে রক্তদহ বিল পর্যটন এলাকায় রূপান্তরিত হয়। শীতকালে এখানে বিচিত্র অতিথি পাখির দেখা মেলে।
